ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ , , ১৫ জমাদিউস সানি ১৪৪০

অকালে রূপালি চাঁদে রূপালি গিটারের শিল্পী ‘এবি’

ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন, । সি এন এন বাংলাদেশ

আপডেট: অক্টোবর ২৪, ২০১৮ ৩:২৮ দুপুর

কাতার থেকে :: আইয়ুব বাচ্চুর অসময়ে চলে যাওয়া সুরপিয়াসীদের কাঁদিয়ে বড্ড অকালে রুপালি চাঁদের দেশে পাড়ি জমালো কিংবদন্তি রকশিল্পী আইয়ুব বাচ্চু। ভাবতেই পারছি না, তাঁর শৈল্পিক আঙুলের ছোঁয়ায় রুপালি গিটার আর ছড়াবে না সুরের ইন্দ্রজাল।

আইয়ুর বাচ্চুর কনসার্ট মানেই হাউজফুল, সে হোক বিশাল মিলনায়তন, স্টেডিয়াম কিংবা উন্মুক্ত ময়দান। হ্যামিলনের বংশীবাদকের বাঁশির সুরের মতো, আইয়ুব বাচ্চুর জাদুকরী গীটারের টানে তাঁর কনসার্টে ছুটে যেত লক্ষ তরুণ ও যুবকের দল। সেই আইয়ুব বাচ্চুকে শেষ বিদায় জানাতে ঢাকা এবং চট্টগ্রাম শহরের রাস্তায় যেরকম সব বয়সের, সব শ্রেণির জনতার শোকার্ত ঢল নেমেছিল, তা দেখে মনে হয়েছে রকস্টার নয়, মানুষ যেন তাদের সবচেয়ে প্রিয় কোনো কিছুকে হারিয়েছে। সুরের মায়াজাল ছড়িয়ে বাচ্চু মানুষের আত্মার গভীরে জায়গা করে নিয়েছিল। তাইতো সবার অপার ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে অবশেষে ফিরে গেল নিশ্চিত গন্তব্যে।

পুরো নাম আইয়ুব বাচ্চু, তবে ভক্তদের কাছে ‘এবি’। বয়সে অনুজ আইয়ুব বাচ্চু আমার মতো চট্টগ্রাম মুসলিম হাইস্কুলের ছাত্র ছিল। স্কুলজীবনে তেমন যোগাযোগ না থাকলেও, প্রখ্যাত ব্যান্ড সোলসের একজন প্রাক্তন সদস্য হিসেবে পরে আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে আমার সখ্য গড়ে ওঠে। ছোটবেলা থেকে মা এবং গীটার এ দুটোই ছিল বাচ্চুর সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী। স্কুল জীবনে অন্য সবাই যখন খেলাধুলায় মত্ত, বাচ্চু তখন গীটারের মধ্যেই ডুবে থাকত। তবে আইয়ুব বাচ্চুর কিংবদন্তি হয়ে উঠার পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। অনেক ঘাম ঝরিয়ে, বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে তবে সফল হয়েছিল এবি। সেইযুগে এখনকার মতো ত্বরিত সাফল্য পাওয়ার কোনো সিঁড়ি ছিল না। ছিল না গানের কোনো রিয়েলিটি শো। টেলিভিশন চ্যানেল ছিল কেবল বিটিভি। এখন ইউটিউব কিংবা ফেসবুকে ভাইরাল হতে পারলে তো কথাই নেই! ওই সময় বিয়ের আসর, গায়ে হলুদ থেকে শুরু করে কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠান ইত্যাদি যেখানেই সুযোগ পেতাম গান করতাম। তারপর রেডিও, টেলিভিশনে অডিশন। আইয়ুব বাচ্চুও এর ব্যতিক্রম ছিল না।

১৯৮২ সালে সোলসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আহমদ নেওয়াজ ভাইয়ের হাত ধরে লিড গিটারিস্ট হিসেবে সোলস ব্যান্ডে যোগ দেয় আইয়ুব বাচ্চু। ঠিক ওই সময় বের হয় সোলসের প্রথম অডিও অ্যালবাম ‘সুপার সোলস’। পুরো দেশজুড়ে তুমুল আলোড়ন তোলে প্রায় প্রতিটি গান। ওই অ্যালবামে আমার লেখা তিনটি গান ছিল—‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে’, ‘মুখরিত জীবন’ এবং ‘ভুলে গেছো তুমি’। এই অ্যালবামের সংগীতায়োজনে আইয়ুব বাচ্চুর গীটারের অমোঘ ছোঁয়া ছিল। আশি দশকের শেষের দিকে বাচ্চু সোলস ছেড়ে নিজের ব্যান্ড এলআরবি গড়ে তোলে। আমার মতে, এটাই ছিল বাচ্চুর সংগীত জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। খ্যাতির তুঙ্গে থাকা সোলস ছেড়ে যাওয়া চাট্টিখানি কথা ছিল না। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল বাচ্চু। আইয়ুব বাচ্চু শুরুতে ইংরেজি গান গাইত। জিমি হেন্ড্রিক্স, জিম্মি পেজ, রিচি ব্ল্যাকমোরের গীটারের বাজনায় অনুপ্রেরণা খুঁজত।

বাচ্চু বাংলা মেলোডির সঙ্গে ওয়েস্টার্ন ও রক মিউজিকের ফিউসন করে একটা নতুন ধারার সৃষ্টি করতে চাইছিল। সোলস না ছাড়লে হয়ত বাচ্চু নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে পারত না, বাংলা সংগীতে হয়ত রকধারার জন্ম হতো না। আইয়ুব বাচ্চুর সোলস ছাড়ার খবর শুনে বিচলিত হয়ে পড়ি। একদিন চট্টগ্রাম নিউমার্কেটে দেখা হতেই বলল, ‘ভাই, সোলস ছেড়ে দিচ্ছি, দোয়া করবেন।’ যাবার সময় খ্যাতিমান গীতিকার জঙ্গী ভাইয়ের লেখা ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’ গানটিও সোলসের অনুমতি নিয়ে সঙ্গে নিয়ে গেল। আর ঢাকায় গিয়ে শুরু করল রক ব্যান্ড ‘এলআরবি’। এই গানটি সোলসের হয়ে বিটিভিতে পারফর্ম করেছিল বাচ্চু। কিন্তু পরে এলআরবি’র গান হিসেবে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়।

কাকতালীয়ভাবে ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’ গানটির কথাতেই যেন লেখা ছিল বাচ্চুর সুপারস্টার হওয়ার পূর্বাভাস। যেমন ঘুম ভাঙা শহর চট্টগ্রামে একটি কিশোর ছেলের স্বপ্ন দেখার কথা; অতঃপর সেই স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে সাফল্যের অমরাবতীতে আরোহণের কথা, কিংবদন্তি হয়ে উঠবার কথা। আইয়ুব বাচ্চুকে এখন সবাই একজন ব্যান্ড ও রকশিল্পী হিসেবেই জানে। কিন্তু ভার্সেটাইলিটি বা বহুমুখিতাই হলো আইয়ুব বাচ্চুর সবচেয়ে বড় পরিচয়। সে সবধারার গান গাইতে পারত এবং সুরও করতে পারত।

আইয়ুব বাচ্চুর জীবন থেকে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অনেক কিছুই শেখার আছে। সফল এবং কিংবদন্তি হবার কোনো শর্টকাট পথ নেই। মিউজিক ছিল আইয়ুব বাচ্চুর ধ্যানজ্ঞান। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গীটার নিয়ে অনুশীলন করা, বিভিন্ন ধরনের গান শোনা এবং মিউজিক নিয়ে পরিশ্রম করাই ছিল বাচ্চুর কাজ। খ্যাতির শীর্ষে থেকেও কখনো বিশৃঙ্খল জীবনধারায় গা ভাসিয়ে দেয়নি আইয়ুব বাচ্চু। পারিবারিক মূল্যবোধকে আঁকড়ে ধরে শুদ্ধ জীবন যাপন করেছে। অনুজপ্রতিম হয়েও আইয়ুব বাচ্চুর এই অসময়ে চলে যাওয়াটা আমার মতো অনেককে চমকে দিয়েছে। অনন্তে যাত্রা করলেও আইয়ুব বাচ্চুর অন্যজাগতিক সুর অমর হয়ে থাকবে মানুষের হূদয় স্পন্দনে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

লেখক : প্রকৌশলী ও সংগীত শিল্পী