ঢাকা, শনিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৭ , , ২৮ সফর ১৪৩৯

আটকেপড়া রোহিঙ্গাদের নেয়া হচ্ছে বালুখালীতে

স্পেশাল প্রতিনিধি । সি এন এন বাংলাদেশ

আপডেট: অক্টোবর ২০, ২০১৭ ৬:৫৩ সকাল

‘নোম্যান্স ল্যান্ড’-এ চার দিন ধরে আটকেপড়া প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গাকে কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নেয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবির সহায়তায় তাদের বালুখালীতে নেয়ার এ প্রক্রিয়া শুরু হয়। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই তাদের স্থানান্তর প্রক্রিয়া শেষ হবে বলে প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। জানা গেছে, নাফ নদীর ওপারে মিয়ানমার সীমান্তে আরও ১০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছেন। যারা পার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন, তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা দিয়ে ক্যাম্পে পাঠানো হচ্ছে।

কক্সবাজার প্রতিনিধি জানায়,
রোববার থেকে নতুন করে কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালী আঞ্জুমানপাড়া সীমান্ত দিয়ে বানের স্রোতের মতো অর্ধলক্ষাধিক রোহিঙ্গা প্রবেশ করেন। তাদের মধ্যে কৌশলে অনেকেই কুতুপালং, বালুখালী ও আশপাশের এলাকায় চলে আসেন। বিজিবির কড়াকড়ির কারণে ২০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্তের ‘নোম্যান্স ল্যান্ড’-এ অবস্থান নেন। গত চার দিন ধরে তারা সেখানে রয়েছেন। বিজিবি, আইএনজিও এবং বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গা আত্মীয়-স্বজনরা তাদের খাদ্য সরবরাহ করেন। অনেকটা মানবেতর জীবনযাপন করে আসছিলেন তারা। থেমে থেমে ভারি বর্ষণ শুরু হওয়ায় খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করা এসব রোহিঙ্গা চরম দুর্ভোগে পড়েন। শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে অনেক পরিবার খুব বেকায়দায় পড়ে।

বিজিবি কক্সবাজার ৩৪ ব্যাটালিয়নের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর ইকবাল আহমেদ ‘নোম্যান্স ল্যান্ড’-এ আশ্রয় নেয়া ১৫ থেকে ২০ হাজার রোহিঙ্গাকে বালুখালি নিয়ে আসার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বুধবার রাতে তাদের সরিয়ে আনতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পাওয়া যায়। তার আলোকে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রোহিঙ্গাদের কড়া পাহারায় নিয়ে আসা শুরু হয়। এ কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক সংস্থা আরআরসি, ইউএনএইচসিআর এবং আইওএম সহযোগিতা করছে বলে জানান মেজর ইকবাল। উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এবং রোগ প্রতিষেধক টিকা কার্যক্রমের সমন্বয়কারী ডা. মিসবাহ উদ্দিন আহমেদ জানান, নতুন করে আসা সাড়ে সাত হাজার রোহিঙ্গাকে টিকা খাওয়ানো হয়েছে। শারীরিক অবস্থা ভালো ছিল না বলে এমআর এবং ওভিবা নামে দুইটি টিকা দেয়া সম্ভব হয়নি। ‘নোম্যান্স ল্যান্ড’-এ অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১৫ হাজারের মতো বলে ধারণা করছেন তিনি।

সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের কুতুপালং ও ঘুমধুম এলাকায় রাখা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের সেবারত আইএনজিও এসিএফের ডিপিএম ইসমাইল ফারুক মানিক জানান, গত চার দিন ধরে প্রায় ২০ হাজারের মতো খিচুড়ির প্যাকেট তারা এখানে বিতরণ করেছেন। খিচুড়ি শেষ হওয়ায় পুষ্টিসমৃদ্ধ বিস্কুট বিতরণ করা হয়। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর বিশুদ্ধ পানি, ইউএনএইচসিআরসহ বেশকিছু সাহায্য সংস্থা এসব রোহিঙ্গার মাঝে জরুরি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করে। পালংখালি আঞ্জুমানপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও উখিয়া উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা মামুন নিলয় জানান, সকাল থেকে নোম্যান্স ল্যান্ড থেকে রোহিঙ্গাদের সরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিকাল পর্যন্ত অধিকাংশ রোহিঙ্গাকে বালুখালী নিয়ে আসা হয়েছে।

বালুখালী এলাকার স্থানীয় লোকজন রোহিঙ্গাদের নতুন করে স্থানান্তর নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। অনেকে বলছেন, মানবিক কারণে তাদের স্থানান্তর মেনে নেয়া যায়। আবার অনেকের মতে, বালুখালীতে এভাবে ঢালাও স্থানান্তর হলে আর কোনো জায়গা খালি থাকবে না। রোহিঙ্গা স্রোতে ভরে যাবে পুরো এলাকা। কারণ আগে থেকেই বালুখালীতে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প ঠাসা। এ অবস্থায় নতুন করে রোহিঙ্গা আনা হলে স্থানীয় লোকজনের স্বাভাবিক চলাফেরাও কঠিন হয়ে পড়বে। তবে উখিয়া উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেন, ‘নোম্যান্স ল্যান্ড’ থেকে আটকেপড়াদের উদ্ধারে মানবিক দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে। কারণ সেখানে অনাহারে মৃত্যুর মুখে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে রোহিঙ্গাদের। স্থানান্তর করা রোহিঙ্গাদের বড় অংশ রয়েছে নারী ও শিশু। এদের এভাবে দিনের পর দিন ‘নোম্যান্স ল্যান্ড’-এ রাখা যায় না।

নাফ নদীর ওপারে অপেক্ষায় আরও ১০ হাজার : পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১০ দিন আগে রাখাইনের বিভিন্ন গ্রাম থেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশু দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে নাফ নদীর ওপারে (মিয়ানমার অংশে) ফাতেয়ার ঢালার মুখে অবস্থান করছেন। মিয়ানমারের ওই ঢালার মুখে আরও প্রায় ১০ হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছেন। নাফ নদী পার হয়ে যারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন, এমন রোহিঙ্গাদের একজন রাখাইনের বুচিদং মুন্নাপাড়া গ্রামের আলী আহমদের ছেলে ইউসুফ (১৮)। তিনি বলেন, পরিবারের সাত সদস্য নিয়ে গত আট দিন আগে দুর্গম পাহাড়ি, টিলা ও মেঠো পথ পাড়ি দিয়ে নাফ নদীর এপারে আসি। আসার সময় সামান্য কিছু খাবার ছিল, তাও চার দিনের মাথায় শেষ হয়ে যায়।

বুচিদং মগনামা গ্রামের শামিমের স্ত্রী সাজিদা বেগম (২৫) বলেন, তারা গ্রাম থেকে বের হয়েছেন আট দিন আগে। সেখানে মা-বাবাকে রেখে এসেছেন। এখন তাদের কী অবস্থা জানেন না। হাতে টাকা-পয়সা নেই। দুই বছরের শিশুর মুখে এখনও খাবার দিতে পারেননি। একই গ্রামের মৃত কবির আহমদের স্ত্রী মুছুদা খাতুন (৫০) বলেন, তারা পরিবারের ছয় সদস্য নিয়ে এপারে (বাংলাদেশ) পাড়ি দিয়েছেন। পথে পরিবারের তিন সদস্য হারিয়ে যায়। তারা এখন কোথায় কেমন আছে, জানেন না। গত চার দিন ধরে মুখে খাবার জোটেনি। এভাবে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার পথে অনেকেই হারিয়েছেন মা-বাবাকে, আবার কেউ হারিয়েছেন নিজের সন্তানকে। নিজ বাস্তুভিটা ও মাতৃভূমি ত্যাগ করে পালিয়ে আসার সময় পথে হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের কষ্ট, দুর্ভোগ, ক্ষুধা, আতঙ্ক তাদের চোখেমুখে।

জানা যায়, গত কয়েক দিনে উখিয়া সীমান্তের নাফ নদী পেরিয়ে অর্ধলক্ষাধিক রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছেন। এভাবে উখিয়ার পালংখালীর আঞ্জুমানপাড়া, ধামনখালী, ওলুবনিয়া, তমব্রুসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে আসছেন রোহিঙ্গারা। ৩৪ বিজিবির উপ অধিনায়ক আশিকুর রহিম দুপুরে উখিয়ার পালংখালী আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তে সাংবাদিকদের বলেন, বিজিবির পক্ষ থেকে মানবিক সব ধরনের সহায়তা দেয়া হচ্ছে। বিজিবির একটি বিশেষ টিম কাজ করছে। রোহিঙ্গারা যাতে বিস্ফোরকজাতীয় কোনো দ্রব্য বহন করে নিয়ে যেতে না পারেন, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আসা এসব রোহিঙ্গার পরিবারগুলোকে ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়ার আগে পানি, শুকনো খাবার ও অন্যান্য সহায়তা করা হচ্ছে। এনজিও সংস্থাগুলো যে মানবিক সাহায়তা দিচ্ছে, বিজিবির পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। _সূত্র আলোকিত বাংলাদেশ অনলাইন