ঢাকা, বুধবার, ২০ জুন ২০১৮ , , ৬ শাওয়াল ১৪৩৯

আমিরাতে দক্ষ কর্মীর পদচারণা বাড়লে ভিসা সমস্যা হবে না-ফারনেক কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন

সি এন এন বাংলাদেশ

আপডেট: জুলাই ১৪, ২০১৭ ৪:০১ দুপুর

বিশ্ববিখ্যাত ফ্যাসিলিটি ম্যানেজমেন্ট কোম্পানী ফারনেক’র অন্যান্য কর্মকর্তাদের সাথে এইচআর ডিরেক্টর গর্বিত বাংলাদেশী আব্দুল্লাহ আল মামুন।

শিবলী আল সাদিক :: সিএনএন বাংলাদেশ :: সংযুক্ত আরব আমিরাত :: সংযুক্ত আরব আমিরাতে কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ কর্মীর পদচারণা থাকলে ভিসা সংকটসহ নানাবিদ সমস্যায় পড়তে হতো না বাংলাদেশকে। অর্থাৎ আমিরাত সরকার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং দক্ষ জনবলকে ভিসা না দিয়ে পারবে না। কেননা আমাদের যে হারে জনবল আমিরাতে এসেছে সে হারে দক্ষতা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিয়ে আমিরাতে আসেনি আমাদের দেশের শ্রমিকরা। ফলে আমাদের শ্রমিকদের উপর যে নির্ভরতা ছিল তা ধীরে ধীরে কমে এসেছে। কথাগুলো বললেন বিশ্ববিখ্যাত ফ্যাসিলিটি ম্যানেজমেন্ট কোম্পানী ফারনেক’র এইচআর ডিরেক্টর গর্বিত বাংলাদেশী আব্দুল্লাহ আল মামুন। যিনি এক দশক ধরে সুইজ্যারল্যান্ড ভিত্তিক, এই কোম্পানীতে উর্দ্ধতন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন।

আব্দুল্লাহ আল মামুন তার কর্মস্থল ফারনেক কোম্পানী প্রসঙ্গে বলেন, এই কোম্পানীতে আমিরাতে সারে চার হাজারের উপর শ্রমিক কাজ করছে। তৎমধ্যে বাংলাদেশী শ্রমিকের সংখ্যা ৩৭০ জন এই ৩৭০ জন বাংলাদেশী এখন দক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। ২০১২ সালে আমিরাতে শ্রমিক ভিসা বন্ধ হওয়ার পর আর কোন শ্রমিক এই কোম্পানীতে নিয়োগ পায়নি। ২০১২ সালের পূর্বে যে সব শ্রমিক ফারনেক কোম্পানীতে আসে আরা এখন বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে বাংলাদেশীদের জন্য যদি ভিসা উন্মুক্ত হয় তাহলে আরো ৩ শতাধিক শ্রমিক এই কোম্পানীতে নিয়োগ পাবে বলে আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান। তবে প্রধান শর্ত এ শ্রমিকরা প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হবে হবে।

গর্বিত বাংলাদেশী আব্দুল্লাহ আল মামুন।
গর্বিত বাংলাদেশী আব্দুল্লাহ আল মামুন।

তিনি বলেন, আমিরাতে নির্মাণ কাজে কিছুটা শিথলতা এসেছে। আর নির্মাণ কাজ যে সব সময় হবে সেটাও কিন্তু নয়। কিন্তু যে কাঠামো নির্মিত হয়েছে সে সব কাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে আমাদের আধিপত্য বজায় নেই। এর এক মাত্র কারণ আমাদের কারিগরী প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত শ্রমিকদের অভাব। ফলে এই স্থানটি দখলে নিচ্ছে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও নেপাল। তিনি বলেন, বিশ্ব এখন পাল্টে যাচ্ছে, প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে বিশ্ব যত এগিয়ে যাচ্ছে তত মানুষের কর্ম ব্যবস্থা কঠিন হয়ে পড়ছে। গায়ের জোর দিয়ে কর্ম করার চেয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার অনেক বেশি হচ্ছে। ফলে আমাদের শ্রমিকদের আগামীতে কিভাবে পারদর্শী করে তুলব তা আমাদের ব্যাপক পরিকল্পনার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। তিনি আরো বলেন, যদিও আমিরাতে ভিসা বন্ধ, ফলে আমিরাতে বাংলাদেশী শ্রমিক আসা বন্ধ রয়েছে। কিন্তু কাজের পরিধি না থাকলে এখানে অযতা শ্রমিক আসা কোনভাবে ঠিক হবে না। সঠিক কাজের গারান্টি ও কাজের উপর দক্ষতা অর্জন করে শ্রমিকদের এখানে আসা উচিত বলে মনে করি। অন্যথায় আমাদের শ্রমিকরা আমিরাতে এসে স্বাভাবিকভাবে বোঝা হয়ে উঠবে।

ফারনেক কোম্পানীটি মধ্যেপ্রাচ্যের শ্রম বাজারে বিশাল আধিপত্য বজায় রেখেছে দীর্ঘদিন ধরে। ১৯৮২ সালে এ কোম্পানীটি দুবাই এ স্থাপিত হয়। কোম্পানীর মূল মালিক হচ্ছেন ইউরোপ ভিত্তিক সুইস গ্রুপ। Priora গ্রুপ কোম্পানীর একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ফারনেক। এ কোম্পানী শুরুতে ৮ শতাধিক লোক বল নিয়ে তাদের কার্যক্রম চালু করলেও বর্তমানে সাড়ে ৪ হাজারের মতন জন বল রয়েছে তাদের। আমিরাতের দুবাই মল, বুর্জ খলিফা, সিটি ওয়াক, এমিরেটস্ এয়ার লাইনস্, দুবাই এয়ারপোর্ট, ইত্তেহাদ এয়ার লাইনস্, ময়দান সোসাইটি, ক্যাপ্রিকান টাওয়ার, টু ইন টাওয়ার, সালাম টাওয়ার সহ প্রায় ২৫০০ ভিলা মেনটেইন্স এ কাজ করে থাকেন এ ফারনেক কোম্পানী। এই কোম্পানীটির মূল দায়িত্বে রয়েছেন গর্বিত বাংলাদেশী আব্দুল্লাহ আল মামুন। কোম্পানীটির নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন সুইজারল্যান্ড’র বংশভূত মার্কাস ওভারলিং।

সংযুক্ত আবার আমিরাতে আরও একাধিক কোম্পানী ফ্যাসিলিটি ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কাজ করলেও ফারনেক কোম্পানীটি প্রথম শ্রেণির কোম্পানী হিসেবে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছে। এ কোম্পানীটি বরাবরে প্রথম শ্রেণির সেবা দিয়ে যাচ্ছেন বলে আরব আমিরাতে তাদের অবস্থানও অত্যন্ত মজবুত। কোম্পানীর আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমাদেরকে পরিবর্তন হতে হবে। ভবিষ্যতে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে আমরা যদি পরিকল্পিত অবস্থান গ্রহণ করি তাহলে শ্রমিকদের এখানে হয়রানির শিকার হতে হবে না। বাংলাদেশের সমৃদ্ধি আনায়নে আমাদের বড় সম্পদ হচ্ছে শ্রমিক। তাই শ্রমিকদের ভবিষ্যতে আরব আমিরাত সহ মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। তিনি বন্ধ ভিসা খোলা প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের দেশে অসংখ্য লোকজন আরব আমিরাতে আসতে আগ্রহী। সে জন্য যদি আমাদের দেশের সাথে আমিরাতের দ্বি-পাক্ষিক আলোচনা সফল না হয়, তাহলে তৃতীয় কোন বন্ধু রাষ্ট্রকে সে ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আমাদের গত ৫ বছরে যেখানে কুটনৈতিক সফলতা আসেনি, সেখানে তৃতীয় পক্ষের কোন রাষ্ট্রের কুটনীতিকের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করা উচিত। এক্ষেত্রে আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র সৌদি আরবকে সাথে নিলে আমাদের সফলতার দ্বার খুলতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে এক্সপো আয়োজন হবে। এজন্য বড় ধরণের প্রস্তুতি অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। কিন্তু সে প্রস্তুতিতে আমরা বাংলাদেশীরা ভূমিকা রাখতে পারছি না। কিন্তু এ প্রস্তুতির অংশীদার হিসেবে ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, ফিলিপাইন ইন্দোনেশিয়ার শ্রমিকরা পুরোদমে কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে এক্সপো আয়োজনে অনেক টুকু অগ্রগতি হয়েছে। সমানে যে সময়টুকু আছে, সে সময়ে প্রয়োজন টেকনিক্যাল সাপোর্ট। কিন্তু সে প্রশিক্ষিত জনবল আমাদের কি আছে? তাই যদিও বা সম্প্রতি ভিসা খোলা প্রসঙ্গে আমাদের দেশের মন্ত্রী মহোদয় আমিরাত সফর করেছেন। তার সফরে যদি ফলপ্রসু কিছু আসে তাহলে এ মুহুর্তে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর। তবে আমাদের ধ্যান ধারণা পাল্টাতে হবে। কেননা আমাদের আগের মত নির্মাণ শ্রমিকের উপর নির্ভর করলে চলবে না। আমাদের এখন প্রশিক্ষিত শ্রমিক যে সব শ্রমিকরা কম্পিউটারসহ টেকনিক্যাল সাপোর্ট দেওয়ার মত ক্ষমতা রাখে। সেসব শ্রমিকের উপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে। তাহলে মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলোতে ধীরে ধীরে আমাদের আধিপত্য বাড়বে। এবং আমাদের শ্রমিকদের হয়রানীর হারও কমে আসবে। তিনি বাংলাদেশের কুটনৈতিক তৎপরতা প্রসঙ্গে বলেন, গঠনমূলক কুটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখলে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারব। শুধু মাত্র শ্রমিক বান্ধব সম্পর্ক নয়, বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও অনেক বেশি অগ্রগতি করতে পারব আমরা। তিনি বলেন, আমাদের দেশে অনেক বিনিয়োগকারী সংযুক্ত আবর আমিরাতে বিনিয়োগ করতে চাই। কিন্তু যথাযথ ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও কাঠামো তৈরিতে ব্যর্থ হয় বলে তারা বিনিয়োগ করতে পারছে না।

ফারনেক কোম্পানীর এইচআর আব্দুল্লাহ আল মামুন ১৯৭১ সালে জন্ম গ্রহণ করেন পটোয়াখালী জেলার বাউফল থানার কেশবপুর গ্রামে। ছিদ্দিক আহমদ ও কোহিনুর বেগমের পুত্র তিনি। বাবা ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক, আব্দুল্লাহ আল মামুন, ছোট ভাই আব্দুল্লাহ আল ফারুক ছাড়া সব বোনেরা বাংলাদেশের নামকরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতায় জড়িত রয়েছে। এর পূর্বে আব্দুল্লাহ আল মামুন চাকরির শুরুতে সিলেটে চা বাগান, তারপর বাংলাদেশের বাটা সু কোম্পানী এবং ওরাসকম টেলিকমে উর্ধতন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন। এরপর ২০০৬ সালে তিনি আমিরাতে ফারনেক কোম্পানীতে এইচআর হিসেবে যোগ দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনসংযোগ বিভাগ নিয়ে পড়াশুনা করেন আবদুল্লাহ আল মামুন। বর্তমানে তিনি স্ত্রী পুত্রদের নিয়ে স্বপরিবারে দুবাইতে বসবাস করছেন। তার বড় ছেলে আব্দুল্লাহ আল মুহিত ও ছোট ছেলে রাশিক তাজোয়ার এবং winchester স্কুলে পড়াশুনা করছেন। স্ত্রী কামরুন্নাহার ব্যাংকার হলেও বর্তমানে স্বামীর সাথে দুবাইতে অবস্থান করছেন। আব্দুল্লাহ আল মামুন বাংলাদেশ সরকারের উদ্দেশ্যে বলেন, আমাদের শ্রমিকদের মধ্যেপ্রাচ্যে অনেক কদর রয়েছে। শুধু মাত্র তাদেরকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। সে জন্য যথটুকু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন তা সরকার যদি গ্রহণ করে আমাদের জন্য আবারও সুবর্ণ সময় ফিরে আসতে পারে। বাংলাদেশের ভিসা উন্মুক্ত হলে তিনি তার কোম্পানীতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাংলাদেশীদের নিয়োগ দিতে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন বলে জানান। তিনি আরও বলেন, দুবাই সরকার সামনে দুবাইকে আরও বেশি সুন্দর, আরও বেশি সমৃদ্ধশালী ও এক মেগা রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করে রেখেছেন। তাই এই পরিকল্পনার সাথে আমাদের অংশীদার হতে এখন থেকে প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি দাবি করেন।