ঢাকা, শনিবার, ২১ অক্টোবর ২০১৭ , , ৩০ মুহররম ১৪৩৯

এবার খাদ্য সংকটে আসছে রোহিঙ্গারা

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম । সি এন এন বাংলাদেশ

আপডেট: অক্টোবর ১২, ২০১৭ ৮:০৭ সকাল

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা, উগ্র রাখাইনদের নিমর্ম নির্যাতনের মুখে আটকা পড়ে চরম খাদ্যাভাবের মুখে এবার বাংলাদেশ অভিমুখে রোহিঙ্গা আগমনের ঢল নেমেছে। স্থল সীমান্তে মাইন বিস্ফোরনের আতংকের মাঝে জলজ সীমান্তের নাফ নদীর সংকীর্ণ শাখা দিয়ে পালিয়ে আসছে রোহিঙ্গারা।

মঙ্গলবার রাতে ও বুধবার সকালে আঞ্জুমান পাড়া, রহমতের বিল ও ধামনখালী সীমান্ত দিয়ে অন্ততঃ ২২ থেকে ২৫ হাজারের বেশী রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেখা যায়। রোহিঙ্গা আগমনের এবার ব্যাপকতায় স্থানীয় লোকজনের মাঝে অসন্তোষ বাড়ছে।

বুধবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে নাফ নদীর সীমান্ত সংলগ্ন উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ধামনখালী পয়েন্ট দিয়ে ৭ থেকে ৮ হাজারের মত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে দেখা যায়। বরাবরের মত এসব রোহিঙ্গাদের অধিকাংশ নারী, শিশু ও বয়স্ক লোকজন।

রোহিঙ্গা স্রোতে থাকা বুচিডং থানার আমির হোসেন (৪০) ও ফরিদা বেগম (৫৫) বলেন, এসব রোহিঙ্গাদের সবাই দুর্বল ও ক্লান্ত। বুচিডংয়ের সাঙ্গমা, ঝুপাড়া গ্রাম থেকে ২২-২৫ দিন পূর্বে ১০-১২ হাজারের মত রোহিঙ্গা সেনা ও রাখাইনদের অত্যাচারে জান বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার জন্য বের হয়। পায়ে হেঁটে বিশাল মরু পর্বত মালা গভীর জঙ্গল পেরিয়ে আসতে অনেক লোক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে।

তারা বলেন, পথে অন্ততঃ ২০ থেকে ২২ জনের মত লোকের অকাল মৃত্যু ঘটেছে। এদের অনেকে নানা রোগের পাশাপাশি খাদ্যাভাব, পানি শূণ্যতা ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

রাচিডং অঞ্চলে ইয়াং মং, ময় দং, ঝাংগামাসহ বিভিন্ন গ্রাম থেকে উখিয়ার পালংখালী আঞ্জুমানপাড়া সীমান্ত দিয়ে বুধবার ভোরে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা আবদুল রশিদ (৩৫), মৌলভী আবদুর শুক্কুর (৬০) বলেন, আমরা যে গুলো বলছি হয়ত আপনাদের খুবই অবিশ্বাস হতে পারে। কারন অনেকের মুখে হয়ত এ ধরনের কথা শুনে আপনাদের আর বিশ্বাস হচ্ছে না। প্রকৃত পক্ষে আমরা খুবই নির্যাতন অত্যাচার সহ্য করে নিজেদের বসতভিটায় সহায় সম্পদ নিয়ে থেকে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য সব কিছু হারিয়ে এক কাপড়ে ভিটে মাটি ছেড়ে বাংলাদেশে জান নিয়ে পালিয়ে আসতে হল। তারা বলেন, রাচিডং এলাকায় রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি তেমন জ্বালাও পোড়াও না করলেও সেনাবাহিনী ও উগ্র রাখাইনরা রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়িতে আটকিয়ে রেখেছে। কোন দোকানপাটে রোহিঙ্গাদের কেনাকাটা করতেও দিচ্ছে না। ফলে সেখানকার রোহিঙ্গাদের মাঝে চরম খাদ্যাভাব ও চিকিৎসা সংকট বিরাজ করছে। সেখানে দালালদের মাধ্যমে টাকা পয়সা দিয়ে কিছু কিছু রোহিঙ্গা পালিয়ে আসতে সক্ষম হলেও অনেকেই এখনো আটকা পড়ে রয়েছে। জানিনা তাদের কি অবস্থা হচ্ছে।

কয়েকদিন সীমান্তে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ কমে আসলেও মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আবারও দলে দলে বাংলাদেশে আসছে রোহিঙ্গারা। মিয়ানমারের ৮ গ্রাম থেকে অর্ধলক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলিম পালিয়ে এসেছে বলে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দাবী। তারা বলেন, রাখাইন প্রদেশে সেনা মোতায়েন নতুন করে সহিংসতা, বাড়ী-ঘরে আগুণ, এলাকা ছাড়তে রোহিঙ্গাদের রাখাইনদের মাইকিং করার পর থেকেই ওই এলাকা থেকে পালাচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলিমরা।

গেল বছরের ৯ অক্টোবর মংডুতে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার পর সেনাবাহিনী রাখাইন জুড়ে অপারেশন ক্লিয়ারেন্স শুরু করে। যা এখনো বলবৎ রয়েছে। সে সময় রাখাইন থেকে প্রায় ১ লক্ষ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এদিকে ২৫ আগষ্ট রাখাইনে সন্ত্রাসী হামলার পর দায় স্বীকারকারী আরসার ১ মাসের এক পক্ষীয় অস্ত্র বিরতির ঘোষণা ৯ অক্টোবর শেষ হয়েছে। নানা কারণে রাখাইন থেকে অভাব অনটন, চিকিৎসা সংকট ও ঘরবাড়িতে আটকা পড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে মরিয়া হয়ে উঠছে বলে রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন।

সম্প্রতি মিয়ানমারে আদম শুমারি অনুযায়ী রাখাইনে প্রায় ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলমান রয়েছে। সেখান থেকে রাখাইনের বিভিন্ন অভ্যন্তরিক বাস্তুচ্যুত ক্যাম্পে আশ্রয়ে রয়েছে এক লক্ষ ৬০ হাজারের বেশী রোহিঙ্গা।

গেল বছরের অক্টোবরের সহিংসতার পর রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। ২৫ আগষ্টে ঘটনার পর ১১ অক্টোবর বুধবার পর্যন্ত রাখাইন থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে অন্তত ৬ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। সব মিলিয়ে প্রায় ৯ লক্ষের কাছাকাছি রোহিঙ্গা আরাকান থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। অবশিষ্ট প্রায় ২ লক্ষের কাছাকাছি রয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে অর্ধলক্ষধিক রোহিঙ্গা সেখানকার বিভিন্ন জেলে রয়েছে। বাকি রোহিঙ্গারাও প্রতিদিন সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে।

৭ অক্টোবর জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রধান মার্ক লোকক বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে আবারও রোহিঙ্গা ঢল নামতে পারে আশংকা প্রকাশ্যের একদিন পরই ব্যাপক আকারে রাখাইন থেকে রোহিঙ্গা আগমন লক্ষ করা যায়।
উখিয়া ও টেকনাফের সাধারণ লোকজন আশংকা প্রকাশ করে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের অতীতের আশ্রয়দানের অভিজ্ঞতা তেমন ভাল নয়। যেভাবে আরো ব্যাপক আকারে রোহিঙ্গা প্রবেশ করছে তাদের খুবই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা।

এ ব্যাপারে পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, গত ২ দিনে পালংখালী সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ২৫ হাজারের বেশী রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছেন। অতিরিক্ত রোহিঙ্গার চাপে এখানকার জনপদে সর্বত্র লোকজনের মাঝে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে। রোহিঙ্গা প্রবেশ বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে আবাসন ও স্যানিটেশন, ও চিকিৎসা সমস্যা। সরকারি বনভূমি ও পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের জন্য ঝুপড়ি ঘর। তবে পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি দাবী করেছেন দায়িত্বরত সেনা কর্মকর্তারা।

সাংগামা থেকে পালংখালী শফিউল্লাহ কাটা ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া মুজিবুর রহমান (৪৫) বলেন, ২০ সেপ্টেম্বর অংসান সুচি সেখানে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু ২১ তারিখ থেকে সেনা সদস্যরা গ্রামে ঢুকে ঘরবাড়িতে আগুন দেয়। গরু-ছাগল হাস-মুরগী লুটপাট করে। এতে রোহিঙ্গারা আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ফলে এ সব গ্রামের রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসতে শুরু করেছে।
মিয়ানমারের বুচিদং থানার থামি থেকে পালিয়ে আসা দিলরুবা বেগম (২৫) বলেন, পাহাড় টিলা ও মেটোপথ পাড়ি দিয়ে ৬ দিন খেয়ে না খেয়ে তিনি নাইক্ষংদিয়া পৌঁছেছেন। সেখান থেকে সাগর পথে বালুখালী অস্থায়ী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তিনি আশ্রয় নেন।

বাংলাদেশ-মিয়ানমারকে বিভক্ত করা নাফ নদীর কাছাকাছি কক্সবাজার এলাকায় ইতোমধ্যেই শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে অতিরিক্ত লোকজনে গাদাগাদি করে থাকছে। সেখানে আরো রোহিঙ্গারা এসে আশ্রয় নেওয়ার কারণে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।

উখিয়ার বালুখালি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি লালু মিয়া বলেন, সম্প্রতি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের শুধু বালুখালী ক্যাম্পে লক্ষাধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে নতুন করে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের স্থান কোথায় হয় সেটা আল্লাহ জানে। অথচ তারা রাখাইনে নিজেদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছে। ওই ক্যাম্পটি সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশের পর প্রথমে সেখানেই আশ্রয় নিচ্ছে। এতদিন তাদের কোথাও পালিয়ে না যেতে এবং তাদের নিরাপত্তা দেয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়ে রেখেছিল মিয়ানমার সেনারা। এখন মনে হচ্ছে, এ ধরনের মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছিল অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের হত্যা ও নিশ্চিহ্ন করার জন্যই।