ঢাকা, শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ , , ৬ রবিউস সানি ১৪৪০

কণ্ঠের জাদুতে কোটি শ্রোতার মন জয় করেছে চট্টগ্রামের শহীদ

মোঃ ফারুক ইসলাম । সি এন এন বাংলাদেশ

আপডেট: আগস্ট ২৪, ২০১৮ ৯:২৬ সকাল


দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব থেকে শুরু করে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশের অর্থনেতিক উন্নয়ন থেকে শুরু করে সাংষ্কৃতিক অঙ্গনে বাণিজ্যিক রাজধানী নামে খ্যাত চট্টগ্রামের মানুষের অবদান অনস্বীকার্য। দেশের অনেক নাম করা গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক এবং শিল্পীর জন্ম চট্টগ্রামে। যারা নিজেদের কর্মদক্ষতা দিয়ে বিশ্বের কাছে দেশকে নানাভাবে উপস্থাপন করে আসছেন। আজ তেমন একজনের কথা লিখছি যার বেড়ে উঠা রাজনৈতিক পরিম-লে। সংগীতের প্রতি আবেগ এবং ভালোবাসার কারণে যার পরিচিতি বাংলাদেশের সংগীত পাগল প্রতিটি মানুষের কাছে। যিনি এক জীবন গান দিয়ে শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন। এক জীবন গান বললেই যার নামটা চলে আসে তিনি আর কেউ নন চট্টগ্রামের কৃতি সন্তান দূরবীন ব্যা-ের ভোকালিস্ট শহীদ। জন্ম ২৩ জানুয়ারী, চট্টগ্রামের কালুরঘাটের মোহরায়। পড়ালেখার হাতেখড়ি মোহরা জামিলুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, এরপর এ.এল.খাঁন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকার ইন্ডিপেনডেন্ড ইউনির্ভাসিটি, স্টামফোর্ড ইউনির্ভাসিটি, এশিয়ান ইউনির্ভাসিটি থেকে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ভারত থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পোস্ট গ্রাজুয়েশন ডিগ্রী অর্জন করেন। তবে শিল্পী শহীদের গানের সাথে সম্পৃক্ততা ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াকালীন সময় থেকে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক ক্লাসে হারমোনিয়াম দিয়ে গান শেখানোর সময় মনযোগ সহকারে শেখার আগ্রহটা তার করতো। তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোন সংগীতগুরুর কাছ থেকে গান শেখা হয়নি। বাড়ির পাশে হিন্দু পাড়ায় মাঝে মাঝে গান শিখতে যাওয়া আর কিছু সময়ে শিল্পকলা একাডেমিতে দলবদ্ধ হয়ে গান শেখা। ঢাকায় পড়াকালীন তিনি ২০০২ সাল থেকে দূরবীন ব্যান্ড গঠনের চেষ্টা চালান। ২০০৪ সালে এসে সাব্বির, নয়নসহ চারজন মিলে প্রিয় দূরবীন ব্যান্ডের যাত্রা শুরু করেন। ২০০৬ সালে দশটি গান নিয়ে প্রথম এ্যালবাম “দূরবীন” শিরোনামে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে দূরবীন টু পয়েন্ট জিরো ওয়ান এবং দূরবীন থ্রি পয়েন্ট জিরো ওয়ান প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় এ্যালবামের কাজ করতে গিয়ে শিল্পী আরেফিন রুমির সাথে পরিচয়। ধানমন্ড আবহানীর খেলার মাঠে খেলতে একদিন আরেফিন রুমি নিজ থেকেই দূরবীন ব্যান্ড সাথে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করলে তাকে নিয়েই ব্যান্ডের গান লেখা শুরু করেন। নিজের প্রথম সলো এ্যালবাম “বৃষ্টির গানে” নিজের গানের পাশাপাশি শিল্পী আরেফিন রুমির চারটি গানও ছিলো। তৃতীয় এ্যালবামের কাজ শেষ হলে আরেফিন রুমি একটা সলো এ্যালবামের কাজ করতে বললে তিনি রাজি হয়ে যান। কলকাতার শিল্পী শুভ মিতার সাথে তার ভালো সম্পর্ক থাকার কারণে পরবর্তীতে ফুয়াদ মুক্তাদিরের পরামর্শে কলকাতার শিল্পী শুভ মিতার সাথে শিল্পী শহীদের এক জীবন শিরোনামে গানে কণ্ঠ দেয়া। এর এক বছর পর এক জীবন গানের মিউজিক ভিডিওটি প্রকাশিত হলে পুরো দেশ জুড়ে গানটি বেশ সাড়া ফেলে। দর্শক, শ্রোতাদের মনে গানটি সহজেই জায়গা করে নেয়। শ্রোতারা শিল্পী শহীদকে নিয়ে কথা বলতে গেলেই চলে আসে এক জীবন গানের কথা। অনেকেই আবার এক জীবন শহীদ বলে ডাকে। এক জীবন গানের সফলতার পর এক জীবন -২ নামে শিল্পী শুভ মিতার সাথে দ্বিতীয় গানটি প্রকাশিত হলে সেটিও শ্রোতাদের মন জয় করে। সেই থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত প্রায় ২০০ টি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। তবে সঙ্গীতাঙ্গনে তার আসার পথটা মসৃণ ছিলো না। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আজকের জনপ্রিয় শিল্পী শহীদের এ পর্যায়ে আসা। ঢাকায় পড়াকালীন সকালের নাস্তা করে বাসা থেকে বের হয়ে সংগীত পরিচালকদের সাথে দেখা করার জন্য বিভিন্ন স্টুডিওতে গিয়ে বসে থাকতেন কারণ খেতে গেলে যদি সংগীত পরিচালক স্টুডিও থেকে বেরিয়ে যান তাহলে তো সারাদিনের কষ্টটাই বৃথা যাবে। এভাবে কতোদিন যে না খেয়ে সংগীত পরিচালকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন তার কোন হিসাব নেই। ব্যবসার কাজে দিনের সিংহভাগ সময় ব্যয় করলেও গানের

জন্য মন কাঁদে সব সময়। গানের প্রতি ভালোবাসা, আবেগ আর প্রচন্ড টানে যখনই সুযোগ পান গান নিয়েই থাকেন। ঢাকায় দূরবীন ব্যান্ড গঠন করার পর এ্যালবামের কাজে সব সময় সহযোগিতা করে গেছেন শিল্পী শফিক তুহিন, বাপ্পা মজুমদার, ফুয়াদ আল মুক্তাদির, পঞ্চমসহ আরো অনেকেই। তাঁদের সহযোগিতায় শিল্পী শহীদের এগিয়ে যাওয়া। চট্টগ্রামের সন্তান হিসেবে চট্টগ্রামের তরুণ শিল্পীদের প্রতি তার পরামর্শ হলো কোন গান করতে হলে সময় নিয়ে, কষ্ট করে করতে হবে। একটা গান বের হওয়ার পর খুশিতে গা ভাসালে হবে না। বরং গানের প্রতি যথেষ্ট আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসা থাকতে হবে। কারণ গানটা অনেক সাধনার ব্যাপার। তাড়াহুড়ো করে কোন কাজ করতে গেলে তার ফলাফলটা অনেক সময় ভালো হয় না। তাই সকল তরুণ শিল্পীদের সময় নিয়ে, কষ্ট স্বীকার করার মন মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। সম্প্রতি গীতিকার ফয়সাল রাব্বিকিনের লেখায় এবং রেজোয়ান শেখের সুর ও সংগীতে শিল্পী শহীদের “ বঙ্গবন্ধুর সৈনিক” শিরোনামে একটি গান প্রকাশি

জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত এ গান নিয়ে তিনি বলেন- ছোটবেলা থেকেই তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে উজ্জীবিত একজন মানুষ। তাই বঙ্গবন্ধু মানে বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসার কারণে এ গানটি তিনি শত ব্যস্ততার মাঝেও করেছেন এবং ভবিষ্যতেও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কোন গান গাইতে হলে তিনি ছুটে যাবেন কণ্ঠ দিতে। সংসার জীবনে স্ত্রী, দুই ছেলে আর এক কন্যা নিয়ে তার পথচলা। বড় ছেলে অষ্টম এবং ছোট ছেলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। ব্যবসার কাজে বছরের বেশির ভাগ সময় চট্টগ্রামের বাইরে থাকা হলেও সময় পেলেই ছুটে আসেন প্রিয় চট্টগ্রামে। নিজের এলাকার বন্ধুদের সাথে আড্ডা, ঘোরাঘুরি করে সময় কাটানোটাকে বেশ উপভোগ করেন তিনি। ছোটবেলায় বাগানের সুপারি গাছের সুপারি পেড়ে বিক্রি করে রাজ্জাক, কবরীর সিনেমা দেখতে যাওয়া, সিনেমার গানগুলো মুখস্থ করা। পাড়ার নারিকেল গাছ থেকে নারিকেল পেড়ে বন্ধুদের সাথে ভাগ করে খাওয়া, মানুষকে ভয় লাগানোর স্মৃতিগুলো তার মনে খুব বেশি নাড়া দেয়। বড় হয়ে যখন পরিবারের বড়রা তাকে পাইলট বানাবেন বলতেন, তখন তিনি পাখি হবার স্বপ্ন দেখতেন। কারণ পাখিরা তো মুক্ত। যখন যেখানে খুশি উড়ে যেতে পারে। পাখি হবার স্বপ্নপূরণ না হলেও সংগীতের প্রতি ভালোবাসার কারণে নিজের কণ্ঠ আর গান দিয়ে কোটি শ্রোতার মন জয় করেছেন চট্টগ্রামের কৃতি সন্তান শিল্পী শহীদ।