ঢাকা, বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ , , ৩ রবিউস সানি ১৪৪০

গণপরিবহনে যৌন হয়রানি, আতঙ্কে নারী যাত্রীরা!

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট । সি এন এন বাংলাদেশ

আপডেট: মে ২৭, ২০১৮ ১২:০৯ দুপুর

ঢাকা: রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে গণপরিবহনের নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়েই চলছে। বয়সে ছোট কিংবা বড়, প্রতিনিয়ত এমন ঘটনার শিকার হচ্ছে অনেকেই।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছেন, অধিকাংশ ঘটনায় বাসের চালক, হেলপার বা তাদের সহযোগিরা সরাসরি জড়িত।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশের গণপরিবহনে যাতায়াতে ৯৪ শতাংশ নারী কোনো না কোনো সময় যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আর এদের মধ্যে ৬৬ শতাংশ নারী ৪১-৬০ বছর বয়সী পুরুষদের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হন।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি নামে একটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ মাসে গণপরিবহনে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২২ টি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের পর্যালোচনা করে তৈরি করা এই প্রতিবেদনে তথ্য উল্লেখ করে বলেন, গণপরিবহনের চালক-হেলপারসহ সহযোগীরা মিলে ৯টি গণধর্ষণ, ৮টি ধর্ষণ ও ৫টি শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটিয়েছে।

কয়েকদিন আগে বাড্ডা লিংক রোড থেকে তুরাগ পরিবহনের একটি বাসে উঠেছিলেন উত্তরা ইউনিভার্সিটির এক ছাত্রী। দুপুর ১টার দিকে বাসটি যখন নতুন বাজারে পৌঁছায়, তখন যাত্রীদের বড় অংশ নেমে যায় বাস থেকে। বাইরে অনেক যাত্রী থাকলেও বাসটিতে কোনো যাত্রী উঠাচ্ছিলো না বাসের হেলপার। এতে ওই ছাত্রীর মনে সন্দেহ হয়। তিনি বাস থেকে নামতে চাইলে বাস চালকের সহকারীরা তার পথ আগলে দাঁড়ায়। বাসের হেল্পার তার হাত ধরে টানাটানি করতে থাকে। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে মেয়েটি চলন্ত বাস থেকে লাফিয়ে নেমে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হন।

উত্তরা ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মুখে ওই বাসের চালকসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

ইথিকা করিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যবিজ্ঞান ডিপার্টমেন্টের মাস্টার্সের ছাত্রী। তিনি বলছিলেন, সবচাইতে বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগি যখন সন্ধ্যায় রাস্তায় বের হতে হয়। বাসের ভিতরে গায়ের সাথে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষ। রহস্যময় দৃষ্টিতে তাকায় হেলপার। গাড়ীর ব্রেকে শরীরের উপর হেলা পড়ার সুযোগ খুঁজে অনেকে।

সবকিছু মিলে নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। এই কারণে স্বাধীন দেশে স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করার সাহস আমাদের এখনও হয়ে উঠেনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওম্যান এন্ড জেন্ডার স্টাডিস ডিপার্টমেন্টের প্রফেসার তানিয়া হক বলেন, রাস্তায় কিংবা বাসে চলতে না পারার নারীদের এই ভীতি একদিনে আসেনি। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা, আমাদের আশেপাশে কিছু মানুষ তাদের ভয় দেখিয়েছে, ভয়ের পাবার মত ঘটনা ঘটিয়েছে।

নারীদের সাহসী হয়ে উঠতে হবে বলে তিনি বলেন, এই ভয়ে ভীতু হয়ে বসে থাকলে সমাজের ঐ নোংরা দৃষ্টি থেমে যাবে না, নিজ নিজ জায়গা থেকে প্রতিরোধের দুর্গ গড়ে তুলতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম শক্তিশালী হওয়ায় আজকাল প্রতিবাদ করার একটা বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। সেটাও কাজে লাগানো যেতে পারে বলে মনে করেন এই প্রফেসর।

অন্যদিকে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ এক জরিপে বলছে, ৮৭ শতাংশ নারী বাস টার্মিনাল বা ট্রেন স্টেশনের মতো জায়গায় হয়রানির শিকার হয়। রাস্তায় ৮০ শতাংশ আর স্কুল-কলেজের বাইরে প্রায় ৭০ শতাংশ নারী।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, পরিবহনে নির্যাতনের শিকার সবচেয়ে বেশি কর্মজীবী নারীরা। আমরা যদি তাদের নিরাপত্তা দিতে না পারি কেন তাহলে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিচ্ছি। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই পারে এই সমস্যার সমাধান করতে।

পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, বিগত কিছুদিনে এসব ঘটনায় ৬০ জনেরও অধিক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তার বিষয় প্রথম থেকেই গুরুত্ব দিয়ে দেখছি আমরা।