ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬ মার্চ ২০১৯ , , ১৯ রজব ১৪৪০

দল বদলঃ জয় বাংলা বনাম বাংলাদেশ জিন্দাবাদ

নুর মোহাম্মদ (নুর) । সি এন এন বাংলাদেশ

আপডেট: ডিসেম্বর ১৬, ২০১৮ ৩:৩৪ দুপুর

যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন  “Some men change their party for the sake of their principles; others their principles for the sake of their party.” কিছু মানুষ তাদের নীতির জন্য দল পরিবর্তন করে; অন্যরা তাদের দলের জন্য নীতি”।অনেকে বলেন রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই আসলে সঠিক বাক্যটি হবে “রাজনীতিতে শেষ নীতি বলতে কিছু নেই”। একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দল-মতাদর্শের পাইকারি নিলাম দেখলাম। জাতির পিতাকে কখনো স্বীকৃতি না দেয়া অনেকের মুখে হঠাৎ জয় বঙ্গবন্ধু যেমন শুনলাম তেমনি একসময়ে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ও বিশ্বাসভাজনদেরও মুজিব কোট পরে পালাতেও দেখেছি। নীতির টানাপোড়নে নয়, টার্গেট জাতীয় নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করা, একজন এমপি হওয়া, ক্ষমতায় যাওয়া। 

বিএনপিতে সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজার করুন লাঞ্ছনার পরেও মাহি বি বেশ কিছুদিন পর্যন্ত বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিল। আজ পর্যন্ত স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া বলা, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার গুণকীর্তনের মালাজপা এবং বিগত দশ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের মূলধারার দোষদর্শী মাহি বি হঠাৎ করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও জননেত্রীর শেখ হাসিনার যশ ও কীর্তির কথা বলবে; অন্যদিকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর এক সময়ের গুণকীর্তনের জিকির জপা রনির মুখে হয়তো গুণবাদ শুনব স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া বলে। আর এসব শ্রুতিমধুর মন্ত্রমুগ্ধ কথার বুলিতে আমরা আপমর জনগণ বাঁদরনাচের মত হাততালি দিয়ে তৃপ্ত থাকব,হয়তো!!। যে কোন দল অন্য দলের কোন সেলিব্রিটি নির্বাচনে প্রার্থী আসা মানে নিজ দলের কোন না কোন নিবেদিত প্রাণের বলিদান। ১৯৯১ সালে বিএনপি বা ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার পূর্বে যুগ যুগ ধরে দলভক্ত ছাত্রজনতার রক্তে রঞ্জিত হয়েছে এদেশের রাজপথ। ভাষা, দেশ, পতাকা, মানচিত্র আর গণতন্ত্রের প্রশ্নে গুলিবিদ্ধ হতে এদেশের ছাত্র জনতা বুক সব সময় উন্মুক্ত ছিল। নব্বই দশকের ছাত্র জনতার আত্মাহুতির বিনিময়ে গনতন্ত্র পথে অভিযাত্রা করা দুই প্রধান রাজনৈতিক দল সেই সমকালীন ইস্পাতকঠিন বাঘা ছাত্রনেতাদের চেয়ে ব্যবসায়ী, মডেল-সেলিব্রেটি, গায়ক-নায়ক-নায়িকাদের হাতে দল-দেশের দায়িত্ব দিতে দেখে আমি বিস্মিত হই। এটি প্রাজ্ঞ রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি অপ্রতুলতার ইঙ্গিত।

ভাষা আন্দোলন থেকে এই পর্যন্ত প্রত্যেক গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে ছাত্র আন্দোলন মুখ্য ভূমিকা  রয়েছে। বর্তমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ছাত্রনেতারা যেমনটা অচিরেই সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠে, নব্বই পূর্ববর্তী ছাত্রনেতাদের অবস্থা তেমন ছিল না। স্বৈরাচার এরশাদ ও ‍খালেদা জিয়া বিরোধী অসহযোগ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া চট্টগ্রামের সামনের সারির ডাকসাইটে ছাত্রনেতা সীমান্ত তালুকদার আমার কাছে তেমন একটি উদাহরণ। আদর্শিক, সৃষ্টিশীল, সৃজনশীল ছাত্র রাজনীতির এই ধারাতে সারা বাংলাদেশে এমন শ’খানেকের বেশি হবে বলে মনে হয় না।এই ধরনের সাবেক ছাত্র নেতাদের দলে জায়গা করে দেয়া দলীয় কর্তব্য বলে মনে করি।

আব্দুল কাদের সিদ্দিকী, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সমরনায়ক। তাঁকে বঙ্গবীর নামেও ডাকা হয় যদিও বা এটা কোন রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক খেতাব নয়।মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য তাঁকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করা হয়।মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বাহিনী কাদেরিয়া বাহিনী তাঁর নেতৃত্বে গঠিত ও পরিচালিত হয়েছিল। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কিছু কিছু অপ্রত্যাশিত কথাবার্তা ও সিদ্ধান্ত অতীত এর বীরত্ব মাখা কীর্তি ও অর্জনকে নীরসকরে দিয়েছে। একসময়ে জামায়াত, রাজাকার, আলবদর আলশামস এর যমদূত কাদের সিদ্দিকী আজ আশ্রিত হয়েছে জামায়াতের ছায়াতলে।একই পথে হাটা ডঃ কামাল হোসেন, মান্না, রেজা কিবরিয়ার কথা বাদই দিলাম।

মাহি বি চৌধুরী (এমবিসি) ও গোলাম মাওলা রনি (জিএমআর) দুজনেই মোহিনীয় বাকপটুতার কারণে এইপ্রজন্মের রাজনৈতিক উৎসাহীদের কাছে কিছুটা জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার মোহে নীতি বিসর্জন দেয়া এসব গল্পপ্রিয় রাজনৈতিক নেতাদের থেকে জাতি কতটুকুনীতিকথা শুনবে তা সময়ই বলে দেবে।

আমি মনে করি পৃথিবীজুড়ে জনকল্যাণে “প্রযুক্তি” রাজনৈতিক দলের চেয়ে দ্রুত ও বেশি ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। সেই প্রত্যয়ে একটি প্রযুক্তি নির্ভর জাতি তৈরির বিকল্প আমাদের নেই, যদিও বা আমাদের অনেক মূলধারার রাজনীতিবিদের কাছে এখনো প্রযুক্তি একটি ভীতবস্তু যেমনটা ইভিএম।

লেখকঃ প্রবাসী, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক