ঢাকা, রোববার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮ , , ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

পর্যটকদের স্বপ্নরাজ্যে থাইল্যান্ড

সি এন এন বাংলাদেশ

আপডেট: জুন ৭, ২০১৫ ৩:২৭ সকাল

http://cnnbangladesh.com/wp-content/uploads/2015/06/Thailand-300x188.jpgসিএনএন বাংলাদেশ ডেস্ক :  থাইল্যান্ড। পুরোটা দেশই বিশ্বের যেকোনো পর্যটকের জন্য অনন্য স্থান। একটু বিরাম কিংবা অফিসিয়াল ট্যুর যা-ই বলা হোক না কেন এ দেশের প্রতিটি কোণে এর অনন্য রূপ-সৌন্দর্যের কোনো কমতি নেই। সাম্প্রতিক মানবিক সঙ্কটে এ দেশেটির সমূদ্রসীমাসহ বেশ কিছু অঞ্চল আলোচনায় এলেও তাতে দেশটির অপরূপ সৌন্দর্যের বিচরণ থামেনি এতটুকুও। সেই পর্যটকদের স্বপ্নরাজ্য নিয়েই বিশেষ প্রতিবেদন- আবুল খায়ের, থাইল্যান্ড থেকে ফিরে পর্যটকদের কাছে এখন স্বপ্নরাজ্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার থাইল্যান্ড। দেশটির আলো ঝলসানো রূপ সারাবিশ্বকেই কাছে টানছে। কর্মজীবনের ক্লান্তির ফাঁকে সবার গন্তব্যস্থল যেন থাইল্যান্ড। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের পরই সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশিদের পদচারণ ঘটছে দেশটিতে। বাংলাদেশি ট্যুরিষ্টদের জন্য থাই ভিসা সহজ হওয়ায় থাইল্যান্ডে বেড়াতে যাচ্ছেন অসংখ্য বাংলাদেশি দর্শনার্থী। তবে শুধু ভ্রমণের জন্য নয়, উন্নতমানের চিকিত্সা সেবা নিতেও ব্যাংকক ছুটছেন বিত্তশালীরা।
পর্যটকদের জন্য থাইল্যান্ড এ মুহূর্তে অন্যতম পছন্দের স্থান। ছবির মতো এই দেশটি যেন নানারকম নিসর্গ আর সমুদ্র আদরে ঘেরা। অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমুদ্র সৈকত এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংবলিত থাইল্যান্ড বিশ্বের পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এজন্য তো থাইল্যান্ডের ব্যাংকক, পাতায়া, ফুকেটে ছুটছেন ভ্রমণপিপাসু অনেক বাঙালি। তবে এই দেশটিতে ভারতীয় পর্যটকদের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি।

রাজধানী ব্যাংককে মাকড়শার জালের মতো ছড়িয়ে আছে অসংখ্য উড়ালপুল। রাতের মায়াবী আলোয় জলপথে শহরটাকে ঘুরে দেখতে লাগে অসাধারণ। বিদেশিদের কাছে ব্যাংকক যেন অন্যতম নিশিজীবন। রাত যত বাড়তে থাকে ততই রঙিন হয় শহরটি। শহরজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য ডান্স বার, ডিস্কো বার। সবখানেই রয়েছে ফ্রি ওয়াই-ফাই ব্যবস্থা। তবে সাম্প্রতিক মানবপাচার ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মহলের চাপের মধ্যে রয়েছে পর্যটকদের লীলাভূমি থাইল্যান্ড।

থাইল্যান্ড পরিচিতি
সর্বশেষ ২০১১ সালের আদমশুমারীর হিসেব অনুযায়ী দেশটির মোট জনসংখ্যা ৬ কোটি ৬৭ লাখ ২০ হাজার ১৫৩ জন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত এই রাষ্ট্রটির মোট আয়তন ৫ লাখ ১৪ হাজার বর্গকিলোমিটার। বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি আয়তন দেশটির। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো থাইল্যান্ড এমন একটি রাষ্ট্র যেটি যুদ্ধকালীন সময় ব্যতীত কখনও আমেরিকা, বৃটিশ বা বিদেশি কোনো শক্তির নিয়ন্ত্রণে ছিল না।

১৯৩২ সালে একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের ফলে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কৃষিপ্রধান দেশ হলেও ১৯৮০-র দশক থেকে থাইল্যান্ডের অর্থনীতির দ্রুত উন্নতি শুরু হয়। ১৭৮২ সালে রাজা প্রথম রাম চাকরি সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে ব্যাংকককে বেছে নেন। দেশটি এশিয়া থেকে মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুর যাবার একমাত্র পথ নিয়ন্ত্রণ করে।

পর্যটকদের কাছে ব্যাংকক
থাইল্যান্ডের সবচেয়ে আধুনিক বিমানবন্দর সুবর্ণভূমি। অসাধারণ দেখতে বিমানবন্দরটি। মনে হয় যেন ইউরোপ-আমেরিকার কোনো বিমানবন্দর। ঢাকা থেকে বিমানযোগে সময় লাগে দুই ঘণ্টা ২০ মিনিটের মতো। সুবর্ণভূমি বিমানবন্দর থেকে সুকোমভিটে যাত্রা করলে সড়কের চারদিকে নান্দনিক দৃশ্যগুলো ক্যামেরায় বন্দিতে ব্যস্ত হতে বাধ্য পর্যটকরা।

বামরুনগ্রাড আন্তর্জাতিক হসপিটালের কাছেই বিস্তৃত বাঙালিপাড়া। বাংলা হাউজ নামের একটি রেস্টুরেন্ট যেন বাংলাদেশের মিনি দূতাবাস। এই বাংলা হাউজে চলে ওয়েস্টার্ন মডেলের বাঙালি আড্ডা। রয়েছে দেশিয় সব ধরণের খাবার। বাংলা হাউজের কামরুল ভাই যেন বাঙালি সেবায় নিবেদিত প্রাণ। বাঙালিদের থাইল্যান্ড ভ্রমণের সব গাইড লাইন দিয়ে থাকেন তিনি। বামরুনগ্রাড আন্তর্জাতিক হসপিটালকে ঘিরে শুধু বাংলা হাউজ নয়, একাধিক বাঙালি রেস্টুরেন্ট গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশি প্রবাসীরা। যদিও বাঙালিদের আরেক পরিচিত মুখ ‘বুলু ভাই’ কিছুদিন আগে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেছেন।

বলে রাখা ভালো ব্যাংকক আধুনিক শহর হলেও অনেক রাজা এই শহরে রাজকীয় ধাঁচের অসংখ্য অট্টালিকা গড়ে তুলেছেন। ব্যাংককের বর্তমান আধুনিক বিল্ডিংয়ের পাশাপাশি এই পুরোনো ধাঁচের বাড়িগুলোও এক অনিন্দ্য সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পর্যটকদের চক্ষু তৃষ্ণা মেটানোর জন্য।

ব্যাংককেই রয়েছে ছাও ফ্রায়া নদী। এই নদীর তীরেই বিশাল এলাকাজুড়ে রাজপ্রসাদ-গ্রান্ড প্যালেস। সোনার রংয়ে মোড়ানো প্রাসাদটি সত্যিই অপূর্ব। এক কালে এখানে বসেই নিয়ন্ত্রণ করা হতো থাইল্যান্ডের সব কার্যক্রম। এখন যদিও সেটি সংরক্ষিত স্থাপনার আওতায় পড়ে গেছে। এই প্রাসাদের পেছনে আছে মন্দির। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় যেমন মসজিদের ছড়াছড়ি তেমনি পুরো ব্যাংকক জুড়ে আবার মন্দির বা ভাটের দাপট। ব্যাংকক থেকে ২৭ কিলোমিটার দূরে সামুত প্রাকার্ন-এ রয়েছে কুমির প্রকল্প। একসঙ্গে প্রায় ৩০ হাজার কুমির আছে এখানে।

ব্যাংকক থেকে পাতায়া
পাহাড় ও সমুদ্রে ঘেরা ছোট্ট শহর পাতায়া। এশিয়ার অন্যতম বিখ্যাত সৌন্দর্যের নগরী হবার কারণে সারাবছরই অসংখ্য নারী-পুরুষের ভিড়ে মুখরিত থাকে পাতায়া। আর এই সব দর্শনার্থীকে মুগ্ধ করতে স্থানীয়দেরও রয়েছে নানা আয়োজন আর সেবা। অন্ধকার নামতেই প্রাণ ফিরে পায় শহরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য ক্লাব, বার, রেস্তোরাঁ। ব্যাংককের দক্ষিণে প্রায় দেড়শ’ কিলোমিটার দূরে এশিয়ার অন্যতম এই সি বিচ রিসোর্ট পাতায়া। ব্যাংকক থেকে যেতে সময় লাগে প্রায় দু’ঘণ্টা। পাতায়া থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নান্দনিক প্রবাল দ্বীপ। যেখানে চলে প্রকৃতির সাজে ছোট পোশাকে নারী-পুরুষের আনন্দ ভাগাভাগির প্রতিযোগিতা।

ডনময়ং থেকে হাতজ্জাই এয়ারপোর্ট
ব্যাংককের ডন ময়ং আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে হাতজ্জাই আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট ১১শ’ কিলোমিটারের পথে পৌঁছাতে সময় লাগে ১ ঘণ্টা ২৫ মিনিট। ২৪০ সিটের থাই লায়ন এয়ারলাইন্সে কোনো সিটই ফাঁকা পাওয়া যাবে না। মাত্র ২২শ’ বাথ দিয়ে আপ-ডাউন করতে পারেন যাত্রীরা। শংখলা প্রদেশের হাতজ্জাই সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশিদের কাছে খুবই পরিচিত নাম। হাতজ্জাই-এর পাশে অবস্থিত পাটাংবেচা জঙ্গলেই মানবপাচার চক্র সিন্ডিকেটের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে মুসলিম অধ্যুষিত হাতজ্জাই থেকে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর খুবই কাছে। হাতজ্জাই শহরের সৌন্দর্য্য যে কাউকে কাছে টানবে।

এই শহরেই রয়েছে মানবপাচারকারী চক্রের শক্তিশালী অবস্থান। বাংলাদেশিদের ব্যাপক সুনাম রয়েছে এখানে। ময়মনসিংহের ছেলে সাইদুল দীর্ঘদিন ধরে এই হাতজ্জাই শহরের বিশাল ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করে আসছেন। কোনো বাঙালি সমস্যায় পড়লেই এগিয়ে আসেন তিনি। আর বাঙালি ট্যুরিস্ট পেলে ‘জামাই আদর’ করেন সাইদুল। তার আচার-ব্যবহারে মুগ্ধ হবেন বাংলাদেশি পর্যটকরা। হাতজ্জাই শহরে পাকিস্তান মসজিদে অবস্থান করেন আরেক বাংলাদেশি চাঁদপুরের হারুন। কোনো মুসলিম মারা গেলে দাফন কার্য সম্পন্ন করেন তিনি।

জেমস বন্ড দ্বীপ ফুকেট
বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় অ্যাকশন থ্রিলার জেমস বন্ড সিরিজের একটি ছবি ‘দ্য ম্যান উইথ দ্য গোল্ডেন গান’। ১৯৭৪ সালে ছবিটি মুক্তি পাবার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব মানচিত্রে পরিচিত হয়ে উঠলো ‘ফুকেট’ দ্বীপটির নাম। আন্দামান সাগরের তীরে থাইল্যান্ডের এ দ্বীপেরই এক সৈকতে ‘দ্য ম্যান উইথ দ্য গোল্ডেন গান’ ছবিটির শুটিং হয়েছিল। তাই জায়গাটির নাম হয়ে যায় ‘জেমস বন্ড দ্বীপ’। আবার স্থানীয়রা ফুকেটকে বলেন ‘আন্দামানের মুক্তো’। রাজধানী ব্যাংককের সাড়ে ৮০০ কিলোমিটার দক্ষিণে থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় এ দ্বীপটিই একটি প্রদেশ। অবশ্য মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে এর একটি সেতু সংযোগও আছে। একসময় ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য প্রসিদ্ধ হলেও এখন এই প্রদেশের প্রধান আয় পর্যটন শিল্প।

ব্যাংকক থেকে ফুকেট যেতে বিমান কিংবা বাস যেকোনো বাহনেই যাওয়া যায়। ভ্রমণপিয়াসীরা ব্যাংকক থেকে মাত্র ১ ঘণ্টা ২৫ মিনিটে ফুকেটে উড়ে যেতে পারেন যেকোনো স্থানীয় বিমানে। চমত্কার ও বিচিত্র সব সমুদ্র সৈকত, পাহাড়ী জঙ্গল, বৈচিত্রময় জীবনযাত্রার মানুষ ফুকেটের বড় আকর্ষণ। ফুকেটের সবচেয়ে বড় সামুদ্র সৈকত পাতং। একে ঘিরেই গড়ে উঠেছে পাতং শহর।

সম্পাদনায়-রফিকুল ইসলাম