ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮ , , ২ রবিউস সানি ১৪৪০

বাঙালি সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও গবেষক মুহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকী

কক্সবাজার প্রতিনিধি । সি এন এন বাংলাদেশ

আপডেট: নভেম্বর ২২, ২০১৮ ১২:২৯ দুপুর

ডা. মো. জামাল উদ্দিন

বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত জেলা কক্সবাজার। যা বর্তমানে পর্যটন এলাকা হিসেবে দেশে-বিদেশে সমাদৃত হয়ে আসছে। ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসের ন্যায় কক্সবাজারের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। মধ্যযুগের আরাকানের অভিন্ন রাজ্য হওয়ায় আরাকান রাজ্যসভায় বাংলাসাহিত্যের প্রভাব তৎকালীন কক্সবাজারকেও আলোকিত করেছিল। এই কক্সবাজার জেলারই বর্তমান চকরিয়া উপজেলাধীন অঞ্চলে একজন সাহিত্য-সাংবাদিকতা জগতের আলোকধারা ও ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকী। আমি চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়নের দক্ষিণ মেধাকচ্ছপিয়া গ্রামের সন্তান। আমার এলাকায় প্রায় দুইশত বছর পূর্বে এই কৃতিপুরুষের জন্ম হওয়ায় এবং সৌভাগ্যক্রমে আমার জন্ম একই উপজেলায় হওয়ায় আমি গর্ববোধ করছি।
মুহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকী একজন বাঙালি সাহিত্যিক, গবেষক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ। মুহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকীর জন্ম ১৮৯৪ সালে কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার ওমরাবাদ তথা কাকরা গ্রামে। তাঁর পিতার নাম আবদুল হাকিম মিঞাজী। তাঁর জাতিসত্তা বাঙালি হলেও নাগরিকত্ব ছিল ব্রিটিশ ভারত (১৮৯৪-১৯৪৭) ও পাকিস্তান (১৯৪৭-১৯৫০)। আবদুর রশিদ সিদ্দিকীর প্রাথমিক জীবন কিংবা তাঁর শিক্ষা জীবন সম্বন্ধে বিস্তারিত জানা যায়নি। তবে তিনি কক্সবাজার মধ্য বাঙ্গালা বিদ্যালয়ে কিছুদিন লেখাপড়া করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষার এখানেই সমাপ্তি ঘটে। গ্রামের উচ্চশ্রেণির স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তরুণ বয়সেই গ্রামছাড়া হন এবং ঔষুধ প্রচার দ্বারা অর্থোপার্জন আরম্ভ করেন। কিন্তু তিনি বিদ্যাচর্চা ত্যাগ করেননি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করতে না পারলেও তিনি সুশিক্ষিত ছিলেন। প্রধানত সুলেখক, সাংবাদিক, সাময়িকী প্রকাশক হিসেবেই আবদুর রশিদ সিদ্দিকী খ্যাতি লাভ করেন। পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকী প্রকাশনায় আবদুর রশিদ সিদ্দিকী প্রশংসনীয় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামে আগমন করেন। ১৯১৯ সালে (বৈশাখ ১৩২৬ বঙ্গাব্দ) তিনি সাধনা নামে একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেন। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ কিছুকাল এই পত্রিকার যুগ্মসম্পাদক হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন। এই পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামসহ বিভিন্ন লেখকের রচনা প্রকাশিত হয়েছিল। পত্রিকাটি চার বছর টিকে ছিল। ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ১৬ শ্রাবণ তার সম্পাদনায় কলকাতা থেকে মোসলেম জগত প্রকাশিত হয়। পত্রিকায় প্রকাশিত তার লেখা সময় থাকিতে সাবধান, বুঝে চল বৃটিশ শীর্ষক সম্পাদকীয়র জন্য তিনি গ্রেপ্তার হন। ১৯২৬ সালে তিনি রক্তসেতু নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এই পত্রিকা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। তিনি ভাষার উপর গবেষণা করেছেন। চট্টগ্রামের ভাষার উপর ভাষাতাত্ত্বিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে তার লেখা চট্টগ্রামী ভাষাতত্ত্ব (১৯৪৬), চট্টগ্রামের ভাষাতত্ত্ব গ্রন্থ রয়েছে। তার রচিত উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে উপেন্দ্রনন্দিনী (১৯১৯), জরিনা (১৯২৬), প্রণয়-প্রদীপ, নুরুন্নেহার ও মেহেরুন্নেছা। কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে রোস্তম সোহরাব (১৯১৬), যবনবধ কাব্য (১৯৪৪) ও পাকিস্তান বিজয় কাব্য (১৯৪৮)। তিনি মোসলেম জগত পঞ্জিকা (১৯৩৮) এর রচয়িতা। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেছেন। ১৯৩৮ সালে তিনি চকরিয়া থানা মুসলিম লীগের সেক্রেটারি এবং কক্সবাজার মহকুমা মুসলিম লীগের সহসভাপতি হন। তিনি দীর্ঘদিন কাকারা ইউনিযন বোর্ডের সভাপতি ছিলেন। বেগম খোশ নামক একটি পেটেন্টপ্রাপ্ত ওষুধ বের করার ফলে তিনি প্রচুর সম্পদ অর্জন করেন। নিজ গ্রামে তিনি মাদ্রাসা, গ্রামরক্ষক সমিতি, পল্লীমঙ্গল সমিতি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনকল্যাণমূলক কাজ করেছেন। সাহিত্য সংস্কৃতি জগতের এই নক্ষত্র মুহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকী ১৯৫০ সালের ২৬ মার্চ নিজ গ্রামে ইন্তেকাল করেন। তাঁকে নিজ গ্রামেই সমাধিত করা হয়। আবদুর রশিদ সিদ্দিকী তরুণ মুসলিম লেখকদের উৎসাহ দিতেন। মুক্তবুদ্ধির লেখক হিসেবে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

লেখক: প্রাথমিক দন্ত চিকিৎসক, কলামিস্ট।