ঢাকা, সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮ , , ১ রবিউস সানি ১৪৪০

ভোটার তালিকায় যুক্ত হচ্ছে ‘হিজড়া’

স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা । সি এন এন বাংলাদেশ

আপডেট: জানুয়ারি ১৩, ২০১৮ ৬:২২ সকাল

বর্তমানে ভোটার হতে হলে নারী বা পুরুষ একটি পরিচয় ‘হিজড়াদের’ বেছে নিতে হলেও এবার জাতীয় পরিচয়পত্রে নিজেদের পরিচয়েই ভোটার হতে পারবেন। চলতি বছরের ভোটার তালিকা হালনাগাদে তাদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ লক্ষ্যে ফরম প্রস্তুত করছে ইসি। তবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা ভোট দিতে পারবেন না।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ‘হিজড়াদের’ ভোটার তালিকায় যুক্ত করতে সম্প্রতি কমিশনের বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর থেকে ভোটার তালিকা হালনাগাদ ফরমে ‘হিজড়াদের’ আলাদা অপশন রেখে নতুন ফরম তৈরি করছে নির্বাচন কমিশন। ২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি ‘হিজড়াদের’ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করে গেজেট প্রকাশ করে সরকার। কিন্তু ইসি ভোটার তালিকায় ‘হিজড়াদের’ তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া থেকে বিরত থাকে। হিজড়ারা ‘নারী’ অথবা ‘পুরুষ’ পরিচয়ে ভোটার হয়ে আসছেন।

বর্তমান কেএম নূরুল হুদার কমিশন হিজড়াদের স্বীকৃতি দিতে উদ্যোগ গ্রহণ করে। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে এসে হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ পরিচয়ে ভোটার করার সিদ্ধান্ত হলো। তবে এসব ভোটার আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘হিজড়া’ পরিচয়ে ভোট দিতে পারবেন না। পরবর্তী সংসদ নির্বাচনসহ সব নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন তারা। কারণ চলতি বছর যারা ভোটার তালিকায় নিবন্ধিত হবেন, তাদের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি। ২৮ জানুয়ারির আগে আইনানুযায়ী একাদশ সংসদ নির্বাচন দিতে হবে ইসিকে। সে হিসাবে ‘হিজড়া’ পরিচয়ে আগামী সংসদ নির্বাচনে তারা ভোট দিতে পারছেন না।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, ইসির ভোটার তালিকায় যেসব হিজড়া অন্তর্ভুক্ত হবেন, তাদের স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র দেবে ইসি। সাধারণ ভোটররা পরিচয়পত্রে যে সুযোগ-সুবিধা পাবেন, একই সুবিধা পাবেন ‘হিজড়ারা’। নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব ও পরিচালক (জনসংযোগ) এসএম আসাদুজ্জামান জানান, ‘হিজড়ারা’ তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে ভোটার হতে পারবেন। ভোটার তালিকা নিবন্ধন ফরমে তৃতীয় লিঙ্গদের জন্য আলাদা অপশন রাখা হচ্ছে।

এ লক্ষ্য কমিশন নতুন ফরম তৈরি করছে। ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়নের শুরু থেকে যোগ্যদের জাতীয় পরিচয়পত্রও দেওয়া হয়। এ সময় ‘হিজড়ারা’ ভোটার হয়ে এলেও তারা ‘নারী’ বা ‘পুরুষ’ ঐচ্ছিক পরিচয়ে ভোটার হতেন। ইসির নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এ বছর থেকে ‘হিজড়ারা’ নিজেদের পরিচয়ে ভোটার হবেন। ২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে হিজড়াদের ‘লিঙ্গ পরিচয়কে’ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে এ সংক্রান্ত ‘নীতিমালা অনুমোদন করা হয়। আগের কমিশন বিভিন্ন সময় হিজড়াদের পরিচয়ে ভোটার করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চাইলেও ব্যর্থ হয়।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, ভোটার তালিকা আইন-২০০৯ এবং ভোটার তালিকা বিধিমালা-২০১২ এ ‘হিজড়া’ লিঙ্গ গণ্য করার কোনো ধারা বা বিধি নেই। ভোটার তালিকা বিধিমালা-২০১২ এর ১০ বিধির আলোকে নিবন্ধন (ফরম-২) এ ভোটারের তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ফিল্ড ক্রমিক ১৭, লিঙ্গ হিসেবে পুরুষ/ মহিলা উল্লেখ রয়েছে। ভোটার হিসেবে পুরুষ বা মহিলা সেজে উপস্থিত হলে তাকে সে বেশে ভোটার করা হয়। কিন্তু সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনে সমান আশ্রয়ের অধিকারী।’ কাজেই একজন নাগরিক হিসেবে তার সব অধিকার রয়েছে। এজন্য হিজড়াদের লিঙ্গপরিচয় দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করে কমিশন। ভোটার তথ্য সংগ্রহের সময় ব্যক্তির লিঙ্গপরিচয় হিসেবে ‘নারী’ ও ‘পুরুষের’ পাশাপাশি ‘হিজড়া’ হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য নিবন্ধন ফরম-২ এ অপশন রাখা হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ক্রোমোজম বা হরমোনে ত্রুটি অথবা মানসিক কারণে কারো লিঙ্গ পরিচয় নির্ধারণে জটিলতা দেখা দিলে বা দৈহিক লিঙ্গ পরিচয়ের সঙ্গে আচরণগত মিল না থাকলে তাদের চিহ্নিত করা হয় ‘হিজড়া’ হিসেবে। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় এ ধরনের ব্যক্তিদের ‘নিচু’ দৃষ্টিতে দেখা হয় বলে পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রর সব জায়গায়ই তাদের হতে হয় নিগৃহীত, অধিকারবঞ্চিত।

এ কারণেই অনেকেই অন্য ‘হিজড়াদের’ সঙ্গে গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে বসবাস শুরু করেন। হিজড়াদের নিয়ে কাজ করছেÑ এমন সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই এ জনগোষ্ঠীকে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল। প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানের সরকার আগেই তাদের এ স্বীকৃতি দিয়ে ভোটাধিকার দিয়েছে। বেসকারি বিভিন্ন সংস্থার জরিপে দেশে ‘হিজড়ার’ সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। তবে সরকারি নিবন্ধিত ‘হিজড়া’ দেশে ৯ হাজার ৮৯২ জন। ৫০ বছরের বেশি বয়সি অক্ষম ও অসচ্ছল বয়স্ক হিজড়াদের মাসে ৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হয়। এছাড়া হিজড়াদের জীবনমান উন্নয়নে প্রাথমিক স্তরে ৩০০ টাকা, মাধ্যমিক স্তরে ৪৫০, উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ৬০০ এবং উচ্চস্তরে ১ হাজার টাকা করে উপবৃত্তি দেয় সরকার।