ঢাকা, রোববার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮ , , ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

শিল্পে না-বোধকতা

সি এন এন বাংলাদেশ

আপডেট: জুন ৬, ২০১৫ ৩:০০ সকাল

http://cnnbangladesh.com/wp-content/uploads/2015/06/Silpa-300x210.jpgসিএনএন বাংলাদেশ ডেস্ক : মুনের শিল্পের গঠন বিশেষে (Particular) নাই। একক ইমেজ বা ছবির ধারণা বিশেষে লুপ্ত থাকে। এটা শিল্পের অধরা রূপ। কেননা বস্তু জগত্ বিশেষে নাই। ভাব বিশেষের সহায়ক মাত্র। শিল্পী মার্ক রথকো এই সহায়ক কাঠামোকে বলেছেন ‘অলৌকিক’ (Miraculous)। যা সামান্যে দেখা পাওয়ার মতো। কিন্তু ভাবের প্রকাশ মাত্র ছবি আকারে ধরা দেয়। ভাব বস্তু নয়। বস্তুর স্বভাব মাত্র। সামান্যই তার প্রকাশভঙ্গি। আর সামান্যেই মুনের প্রকাশ ভঙ্গিমা স্বত এবং স্ফূর্ত। সাদা চোখে দেখলে মনে হবে এটা সামান্যের স্বভাব। তাই মুন স্বভাবে জাতশিল্পী। সেটা কীভাবে?

মুনের শিল্পকর্ম বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এক ধরনের কাব্যিক নিরবতা আছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কাব্যিক নিরবতা কি পদার্থ? নন্দনতাত্ত্বিক দিক থেকে বিবেচনা করলে, সুন্দর বাস্তবের বাড়া। মানে বাস্তবের আকার হতে সংবেদনায় পৌঁছানো। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য দৃশ্যের বাইরেও আবেগ আর অনুভূতি তার ছবিকে নিরবতায় পর্যবসিত করে। আর কাব্যিকতা হলো ধ্যান বিন্দু। প্রকরণের দিক থেকে এটা সাংকেতিক ভাষা সৃষ্টি করে। শিল্পকর্মে রেখা আর ছবির কাঠামোয় এমন ভাব জায়মান, যা মূর্ত ভাবকে নাকচ করে না, বরং মূর্তেরই বিমূর্ত ভাবে হাজির হয়। শিল্পে এই ধরনের রূপক অধরা রূপক থেকে বাহিত। যাকে আমরা বলছি শিল্পে না-বোধকতা। এই নিরবতা সৃষ্টি হয় বিমূর্ত ধাঁচের শিল্পের গঠন কাঠামোয়। বিমূর্ত মানে শিল্পকে ইঙ্গিতময় করে তোলা। এটা অরাজনৈতিক নয়। কেন?

শিল্পকর্মের ক্যানভাসের মুখের অবয়রের দিকে তাকালে সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। যে রাষ্ট্রীয়-সমাজ কাঠামোয় শিল্পীর বসবাস সেই বাস্তবতা অজানা শঙ্কার দিকে নিয়ে যায়। ফলে এই শঙ্কা সহজ বাস্তবতা হতে শিল্পী দূরে ঠেলে দেয়। বাস্তব নিছক বাস্তব না হয়ে ছবিতে বিমূর্তরূপেই ইঙ্গিতময় ভাষা সৃষ্টি হয়। মুনের ক্যানভাসে ফিগার বা মুখের গড়ন স্বাভাবিক নয়। কোথাও মুখ হা হয়ে আছে, কোথাও চোখ অস্পষ্ট ছানাবড়া অথবা নিথর চাহনি যেন সমাজ বাস্তবতারই প্রতিচিত্র। তবে মুনের শিল্পে নারীমুখ যেনবা ক্লেদজ কুসুম। এই দৃশ্যপট এমন এক সংবেদনশীল আকার ধারণ করে, যা শুধু শিল্পীর নয়—গোটা সমাজের, গোটা রাষ্ট্রের, গোটা অর্থনৈতিক কাঠামোর। যে প্রশ্ন মাড়িয়ে সামনে যাবার পথ নেই।

মুনের শিল্পকর্মে রঙের ব্যবহার অবচয়মূলক। তার কাছে সব শঙ্কা আর ভয়ের রঙ এক নয়। দৃশ্যপটের পার্থক্যের কারণে অবচয়টা রঙের পার্থক্যে ঘটে। কেননা নানা বাস্তব পরিস্থিতিতে মানুষের সংবেদনশীলতা বদলায়। বদলায় তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা। এই শিল্পীর ক্ষেত্রে তা একইভাবে প্রযোজ্য। রঙ যেন নানান অবয়বের সাথে নানান রঙের সংবেদনা আর পরিস্থিতির মেলবন্ধন। এটা ঘটনা বিযুক্ত নয়, বরং ঘটনার সাক্ষ্যই বহন করে। আর ঘটনার প্রভাব শিল্পকে আলাদা করে তোলে। কোথাও আবছা রেখা, কোথাও স্পষ্ট রেখা, কোথাও প্রাণোচ্ছটায় বিমূর্ত প্রাণী তার ক্যানভাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

আগে দুয়েক বৃন্দ প্রদর্শনীতে মুন রহমানের উপস্থিতি থাকলেও কোনো একক প্রদর্শনী হয়নি। সেই ক্ষেত্রে ঢাকার কলাকেন্দ্রে এটাই তার একক প্রদর্শনী। তার প্রদর্শনীর নাম ‘Fuzzy Fear’ বা ‘অজানা ভয়’। শিল্পী ওয়াকিলুর রহমান আর কাহকেশা সাবাহ’র কিউরেশনে ‘উদযাপিত সহিংসতা’ নামের ধারাবাহিক প্রদর্শনীর ৪র্থ পর্ব এটি। শেষ কথা, প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যার্থী না হয়েও শিল্পী মুন রহমানের আত্মপ্রকাশ ঢাকার শহরে কমতুল্য ঘটনা নয়। আধুনিক শিল্পকর্মের ভাষা কাঠামো রপ্ত এই নবীন শিল্পীর যাত্রা মসৃণ হোক।

দ্রষ্টব্য : প্রদর্শনী রাজধানীর কলাকেন্দ্রে ২৮ মে থেকে ২০ জুন পর্যন্ত চলবে।
সম্পাদনায়-রফিকুল ইসলাম