ঢাকা, শুক্রবার, ২২ জুন ২০১৮ , , ৮ শাওয়াল ১৪৩৯

সরকারি চাকরিতে বয়স বৃদ্ধি: প্রধানমন্ত্রী বরাবর ছাত্র সমাজের খোলাচিঠি…

সি এন এন বাংলাদেশ

আপডেট: আগস্ট ২৯, ২০১৭ ৪:২০ দুপুর

দীর্ঘদিন ধরে সারা দেশের লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী সরকারী চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ থেকে থেকে বাড়িয়ে ৩৫ বছরে উন্নীত করণের দাবি নিয়ে রাজপথসহ ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আন্দোলনের অংশ হিসেবে নানা রকম কর্মসূচী পালন করে আসছে।
চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধির দাবি দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর ছাত্র সমাজের খোলাচিঠি…
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
বাংলাদেশের লক্ষ কোটি ছাত্র ছাত্রীর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বশ্রদ্ধ সালাম জানাই। আমরা আজ বড়ই অসহায়। বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া সোনার বাংলায় সোনালী স্বপ্ন আজ আমাদের ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। কারণ আজ আমরা ৩০ এর বেড়াজালে বন্দি। কিছুদিন আগে আপনিই যুবনীতি ঘোষণা করলেন। যুবক হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন ৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত। আল্লাহর রহমতে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণে, আবহাওয়াগত কারণে গড় আয়ু আজ আগের তুলনায় বেড়েছে। পাশাপাশি মানুষের কর্মক্ষমতাও বেড়েছে। দীর্ঘ ৫ বছরেরও বেশী সময় ধরে ‘‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র পরিষদ’’ নামের একটি অরাজনৈতিক অহিংস সংগঠন শুধুমাত্র একটি দাবি আদায়ের জন্য নিরলস সংগ্রাম করে যাচ্ছে। আর সেই ছোট্ট দাবিটা হচ্ছে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স সীমা ৩৫ বছর পর্যন্ত করে দেয়া। কিন্তু বিনিময়ে বারবার হতাশা, পুলিশি নির্যাতন আর আপনার না বোধক শব্দ শুনে যাচ্ছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
ওরা কারা? ওরা কি এদেশে বহিরাগত? জাতীয় পরিচয়হীন? ওরা তো এ দেশেরই সন্তান। আপনারই সন্তান। ওদের কারো না কারো বাবা, ভাইরাও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। সেই ৪৮ থেকে শুরু করে ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণ অভভুত্থানে ছাত্ররাই মুখ্য ভূমিকা রেখেছিল। আর সেটাই কালক্রমে মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। সেখানেও ছিল ছাত্রদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। মোট স্বাধীন দেশ এবং বাংলা ভাষা অর্জনের পেছনে ছাত্রদের অবদান অনস্বীকার্য। তাহলে কেন আজ ছাত্রদের এই বেহাল দশা? কত বড় অপরাধ করলে এতটা দুঃখ পোহাতে হয় সেটা হয়ত আপনিই ভাল জানেন! তাইতো আজ আমরা সমাজের চোখে, বৃদ্ধ পিতা-মাতার চোখে ঘৃণিত, অবহেলিত। বর্তমান মাননীয় রাষ্ট্রপতি স্পীকার থাকাকালীন গত ২০১২ সালের ৩১ শে জানুয়ারী সংসদে যখন প্রথম এই বয়স বৃদ্ধির ব্যাপারে প্রস্তাব রেখেছিলেন তখন আপনি বলেছিলেন এটা আপনি ভেবে দেখবেন। দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন হচ্ছে বাংলাদেশে অথচ গত কিছুদিন আগে আমাদের প্রতিবেশী এবং পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে বিনা আন্দোলনে তাদের চাকুরীর ক্ষেত্রে বয়স সীমা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তাছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশের খবর তো আপনি আরও ভাল জানেন। বিশ্বের কোন দেশেই ৩৫ এর নিচে বয়স সীমা নেই। সরকার সচেতন বলেই কোন কোন দেশে ৩৫ থেকে শুরু করে অবসরের আগেরদিন পর্যন্ত সময় সুযোগ দিয়েছে যাতে তাঁদের উচ্চ শিক্ষিত, মেধাবী ছাত্র সমাজ দক্ষ জন শক্তিতে রুপান্তরিত হতে পারে। সরকারী চাকরিতে প্রবেশের বয়স সীমা নিয়ে উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায় এক ভিন্ন রকম চিত্র। যেমন-ভারতের পশ্চিম বঙ্গে ৪০, অন্যান্য প্রদেশে ৩৪-৪০, যুক্তরাষ্ট্রে ৫৯, কানাডাতে ৫৯, সুইডেনে ৪৭, অ্যাঙ্গোলাতে ৪৫, নরওয়েতে ৩৫, কাতারে ৩৫, শ্রীলংকাতে ৪৫, ইন্দোনেশিয়াতে ৪৫, ইতালিতে ৩৫, ফ্রান্সে ৪০, তাইওয়ানে ৩৫ বছর।তাহলে আজ আমরা এত পিছনে কেন?
ওগো মমতাময়ী মা,
শুধুমাত্র আপনার একটি হ্যাঁ বোধক শব্দই আমাদের নতুন করে বাঁচার, স্বপ্ন দেখার, মেধার পরিচয় দেখানোর সুযোগ দিতে পারে। এবার আসেন সেশন জটের নিষ্ঠুরতায়। একবার পিছনে ফিরে তাকান। গত ২০০০ ইং থেকে ২০১৪ ইং পর্যন্ত সেশনে যারা ছিল তাদের অনার্স, মাস্টার্স শেষ করতেই জীবন থেকে কতগুলো বছর হারিয়ে গেছে। এই হারানো অমূল্য সময়কে শত চেষ্টা করেও আমরা আর ফিরে পাবে না।
গত কয়েক বছরের উল্লেখযোগ্য সেশন জটের ভয়াবহ চিত্র নিম্নরূপ-
২০০৮ সালের মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষায় সেশন জট ছিল ২ বছর ১১ মাস ১৮ দিন। ২০০৯ সালের মাস্টার্স পরীক্ষায় সেশন জট ছিল ৩ বছর ১ মাস ৬ দিন। ২০১০ সালে ছিল ৩ বছর ১২ দিন। ২০১১ সালে ছিল ৩ বছর ২ দিন। ২০১২ সালে ছিল ২ বছর ১১ মাস ২৭ দিন। উল্লেখ্য যে, ২০১৩ সালের মাস্টার্স পরীক্ষা শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৭ই মে এবং ২০১৪ সালের পরীক্ষা শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালের ১৭ই এপ্রিল। উক্ত পরিসংখ্যানে গড় সেশন জট ছিল ৩ বছর ২ দিন। তাহলে প্রশ্ন থাকে যে, ২০১৫, ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা কবে নাগাদ শুরু হবে? এমন কঠিন বাস্তবতার পরেও কি আপনি চুপ করে থাকবেন?
অন্যদিকে বিভিন্ন নিয়োগের ক্ষেত্রে বিলম্ব, ইন্টারভিউ কার্ড ইস্যু করতে বিলম্ব, বিভিন্ন আইনি জটিলতা, নিয়োগ স্থগিত সহ নানান জটিলতা। এছাড়া উচ্চ শিক্ষার জন্য অনেকেই চোখে স্বপ্ন নিয়ে দেশের বাহিরে যাচ্ছে। পিএইচডি সহ নানান ডিগ্রী নিয়ে সফলতার সাথে দেশের মুখ উজ্জ্বল করে দেশে ফিরছে। এতে করে কি সময় নষ্ট হয় নাই? উন্নত দেশে মেধা, যোগ্যতা এবং দক্ষতার ভিত্তিতে বিভিন্ন সেক্টরে লোকবল নিয়োগ করে। এই উচ্চ ডিগ্রী দারীরা চাইলেও আমাদের দেশের সরকারি কোন সেক্টরে কাজ করতে পারছে না। পাশাপাশি সরকারও এমন যোগ্য, দক্ষ লোককে সরকারি সেক্টরে নিতে পারছে না। এতে করে সে দেশের কোনই কাজে আসে না। কারণ বয়সের সীমাবদ্ধতা নামক হাতকরায় তারা বন্দি। অবশেষে বাধ্য হয়ে দেশে বেঁচে থাকার তাগিদে কিছু করবে নয় বহির্বিশ্বে পদার্পণ করবে। এতে স্পষ্ট করে মেধা পাচার, মেধার বিড়ম্বনা দুটোই হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশ একদিন উচ্চ ডিগ্রী দারী এবং মেধা শুন্য হয়ে পড়বে। জাতি হয়ে পড়বে পঙ্গু ও স্থবির।
আপনি তো সেই সোনার বাংলা গড়ার কারিগর, বাঙ্গালি জাতির মহান পিতা এবং নেতা বঙ্গবন্ধুরই সুযোগ্য কন্যা। বঙ্গবন্ধুর চাওয়া তো কখনোই এমন ছিল না। বঙ্গবন্ধুর এই সোনার বাংলায় যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারনে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা আজ শিল্পায়নের উপযোগী। শিল্পায়নের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। দেশে প্রাইভেট সেক্টরের অভাব নেই। ৩০ পরবর্তী বয়সকে গুরুত্ব না দেয়ায় এবং প্রৌঢ় বলে আখ্যায়িত করায় বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি সহ অন্যান্য প্রাইভেট সেক্টরও আজ ত্রিশোর্ধদের ফিরিয়ে দিচ্ছে।
মাগো,
একটিবার আমাদের মত কপাল পোড়াদের দিকে সুদৃষ্টি দিয়ে তাকান। এই আপনি চাইলেই আমাদের উদ্ধার করতে পারেন। তাছাড়া আপনি তো ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার রূপকার। লক্ষ কোটি ছাত্রছাত্রীদের বাদ দিয়ে কি আপনি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে পারবেন? ভেবে দেখেন, আমাদের মাঝেও লুকিয়ে আছে দ্বিতীয় বঙ্গবন্ধু, মহাত্মাগান্ধি, ফজলুল হক, চে-গুয়েভারা দের মত প্রতিভা। দয়া করে নিজের সন্তানদের আর কষ্ট দিয়ে অন্ধকারে ঠেলে দিবেন না। পরিশেষে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র পরিষদ এবং সারা বাংলার আপামর ছাত্রছাত্রীদের পক্ষ থেকে আপনার কাছে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি, অনতিবিলম্বে আমাদের দাবি মেনে নিয়ে সরকারী চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করে দিন।

মোঃ নাজমুল হোসেন, (হবিগঞ্জ থেকে) এবং
মোঃ ইমতিয়াজ হোসেন (ঢাবি) এম এ আলী, নাদিয়া সুলতানা, নাঈম, নূরউদ্দিন, কানিজ সুবর্ণা (ইডেন মহিলা কলেজ), ফারজানা আক্তার নাইস (ইডেন মহিলা কলেজ), মুন (ইডেন মহিলা কলেজ), লিন্ডা ফেরদৌস (ইডেন মহিলা কলেজ), ইমরান মাসুদ, জিলানি, রুহুল আমিন তপু, আমান, ইহসান আহমেদ, তাওহিদুর ইসলাম শিকদার, মিজানুর রহমান, সোহেল, রাকিব, তৌফিক, মাসুদ প্রমুখ।

 

নোট : লেখাটি ছাত্র সমাজের পক্ষে নিন্মোক্ত ব্যক্তিদের নিজস্ব মতামত। এখানে সম্পাদকের কোন দায় নেই।